ক্রিকেট বিধাতা বড়ই অদ্ভুত চিত্রনাট্য লেখেন। খেলার মাঠের সীমানা যে কেবল ভৌগোলিক রেখা নয়, বরং আবেগের এক বিশাল সমুদ্র—তা আরও একবার প্রমাণ হতে যাচ্ছে আজ। আজ মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি), টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের এক হাইভোল্টেজ ম্যাচে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ম্যাচের জয়-পরাজয়ের সমীকরণের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে এক খেলোয়াড়ের গল্প। তিনি এহসান আদিল। একসময় যার গায়ে জড়িয়েছিল পাকিস্তানের সবুজ জার্সি, যিনি ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন নিজ মাতৃভূমির; ভাগ্যের ফেরে সেই এহসান আদিল আজ যুক্তরাষ্ট্রের জার্সিতে বল হাতে দৌড়াবেন বাবর আজম, শাহিন আফ্রিদিদের বিপক্ষে।
যুক্তরাষ্ট্র দলের পেসার জাসদিপ সিংয়ের ইনজুরি যেন এহসান আদিলের জন্য এক নতুন দুয়ার খুলে দিয়েছে। টুর্নামেন্টের মাঝপথে জাসদিপ ছিটকে যাওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে দলে ডাক পেয়েছেন অভিজ্ঞ এহসান আদিল। যুক্তরাষ্ট্রের টিম ম্যানেজমেন্ট নিশ্চিত করেছে, মঙ্গলবার পাকিস্তানের বিপক্ষে মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে স্কোয়াডে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে তাকে। যদি আজ তিনি মূল একাদশে জায়গা পান, তবে ক্রিকেট বিশ্ব সাক্ষী হবে এক বিরল ও আবেগময় মুহূর্তের। যে দেশের আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা, যে দেশের হয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক—আজ সেই দেশের বিপক্ষেই ‘শত্রু’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হবে তাকে।
এহসান আদিলের উত্থান ছিল উল্কার মতো। ২০১৩ সাল, সেঞ্চুরিয়ন টেস্ট। দক্ষিণ আফ্রিকার কঠিন কন্ডিশনে পাকিস্তানের হয়ে টেস্ট অভিষেক হয় মাত্র ২০ বছর বয়সী এক দীর্ঘদেহী তরুণের। অভিষেকেই তিনি জানান দিয়েছিলেন নিজের জাত। টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ওপেনার ও দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন অধিনায়ক গ্রায়েম স্মিথকে আউট করে আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম উইকেটটি শিকার করেছিলেন তিনি। তার সেই ইনসুইং ডেলিভারিটি এখনও ক্রিকেট বোদ্ধাদের স্মৃতিতে উজ্জ্বল।
টেস্ট অভিষেকের মাত্র তিন মাসের মাথায় ওয়ানডে ক্রিকেটে অভিষেক হয় তার। তার বোলিং ভেরিয়েশন এবং উচ্চতা তাকে দ্রুতই পাকিস্তান জাতীয় দলে জায়গা করে দেয়। ২০১৫ সালে অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ওয়ানডে বিশ্বকাপের পাকিস্তান স্কোয়াডেও জায়গা করে নিয়েছিলেন তিনি। সেই বিশ্বকাপে আয়ারল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে মাঠেও নেমেছিলেন। তখন মনে করা হয়েছিল, পাকিস্তানের পেস বোলিংয়ের ভবিষ্যৎ হতে যাচ্ছেন এই তরুণ।
কিন্তু প্রতিশ্রুতিশীল শুরুটা ধরে রাখা সম্ভব হয়নি এহসানের পক্ষে। ২০১৫ বিশ্বকাপের পর বাংলাদেশ সফরে পাকিস্তান দলের সঙ্গে এসেছিলেন তিনি। কিন্তু দুর্ভাগ্য যেন তার পিছু ছাড়ছিল না। হ্যামস্ট্রিং ইনজুরির কারণে সেই সফরে কোনো ম্যাচ না খেলেই ছিটকে পড়তে হয় তাকে। এরপর পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের (পিসিবি) নির্বাচকদের রাডারে আর সেভাবে আসতে পারেননি তিনি। ঘরোয়া লিগে পারফর্ম করলেও জাতীয় দলে ফেরার দরজা একরকম বন্ধই হয়ে যায়। সব মিলিয়ে পাকিস্তানের হয়ে মাত্র ৩টি টেস্ট ও ৬টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেই থমকে যায় তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার।
পাকিস্তানের ক্রিকেটে ভবিষ্যৎ অন্ধকার দেখে, জীবনের প্রয়োজনে এবং ক্রিকেটের টানে তিনি পাড়ি জমান সুদূর আমেরিকায়। গত কয়েক বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের মাইনর লিগ এবং মেজর লিগ ক্রিকেটে নিয়মিত পারফর্ম করে আসছেন তিনি। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পাওয়ার পর এবং আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পার করার পর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেন। ৩৩ বছর বয়সী এই পেসার এখন অভিজ্ঞতার ঝুলি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পেস অ্যাটাকের অন্যতম ভরসা। তার লাইন, লেংথ এবং পুরনো বলের কারিকুরি যুক্তরাষ্ট্রের কন্ডিশনে বেশ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মঞ্চে আজ পাকিস্তান বনাম যুক্তরাষ্ট্র ম্যাচটি কেবল ২২ গজের লড়াই নয়। পাকিস্তানের জন্য এই ম্যাচটি তাদের সম্মান পুনরুদ্ধারের লড়াই, আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এটি নিজেদের ক্রিকেট শক্তি প্রদর্শনের সুযোগ। এহসান আদিল যদি আজ একাদশে থাকেন, তবে তার জন্য এটি হবে এক বিশাল মানসিক পরীক্ষা। একসময়ের ড্রেসিংরুম শেয়ার করা সতীর্থ কিংবা অনুজদের বিপক্ষে বল করা যেকোনো পেশাদার ক্রিকেটারের জন্যই চ্যালেঞ্জিং।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এহসান আদিলের অন্তর্ভুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘গেম চেঞ্জার’ হতে পারে। কারণ, তিনি পাকিস্তানের ঘরোয়া ক্রিকেট এবং খেলোয়াড়দের মানসিকতা সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখেন। বাবর আজম বা রিজওয়ানদের দুর্বলতা তার জানা থাকার কথা, যা যুক্তরাষ্ট্রের অধিনায়ক মোনাক প্যাটেল কাজে লাগাতে পারেন।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের ভক্তদের জন্য বিষয়টি মেনে নেওয়া কিছুটা কষ্টকর হতে পারে। নিজেদের ঘরের ছেলে আজ অন্যের হয়ে তাদেরই হারানোর ছক কষছেন—এটি খেলার মাঠের নিষ্ঠুর বাস্তবতা। তবে পেশাদারিত্বের যুগে এমন ঘটনা এখন আর বিরল নয়।
২০১৫ থেকে ২০২৬—মাঝখানের এই ১১ বছরে অনেক জল গড়িয়েছে সিন্ধু নদে। এহসান আদিলের জীবনও বদলে গেছে নাটকীয়ভাবে। আজকের ম্যাচে তিনি উইকেট পাবেন কি না, কিংবা যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে হারাতে পারবে কি না, তা সময় বলে দেবে। কিন্তু এহসান আদিল আজ মাঠে নামলে প্রমাণ করবেন যে, ক্রিকেটে শেষ বলে কিছু নেই; স্বপ্ন এবং সংগ্রাম মানুষকে এক দেশ থেকে অন্য দেশে, এক জার্সি থেকে অন্য জার্সিতে নিয়ে যেতে পারে। ইটিসি বাংলার পাঠকরা আজ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করবেন এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটির জন্য।
