বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম কালো অধ্যায় গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচারের লক্ষে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আজ রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) এক ঐতিহাসিক ও লোমহর্ষক জবানবন্দি প্রদান করেছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া। ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক ও বহুল আলোচিত মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এক নম্বর সাক্ষী হিসেবে তিনি এই জবানবন্দি দেন।
ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে দেওয়া এই জবানবন্দিতে তিনি বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমল থেকে শুরু করে শেখ হাসিনার শাসনামল পর্যন্ত সেনাবাহিনীতে রাজনীতিকরণ, গুমের সংস্কৃতি চালু এবং বিডিআর বিদ্রোহ পরবর্তী নির্মমতার চিত্র তুলে ধরেন। বিশেষ করে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কীভাবে সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করেছেন এবং প্রতিষ্ঠানটিকে দুর্নীতিগ্রস্ত করেছেন, সে বিষয়ে তিনি চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেন।
জবানবন্দির শুরুতে জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া ২০০৭ সালের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “২০০৭ সালে নির্বাচনের আগে প্রধান বিচারপতির বয়স বাড়ানোকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক সংঘাত শুরু হয়, তার পরিপ্রেক্ষিতেই দেশে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল। ওই সময় (২০০৭-২০০৯) ডিজিএফআই বা প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর কার্যত দেশের মুখ্য নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে।”
তিনি আদালতে বলেন, ওই সময় থেকেই বিভিন্ন ব্যক্তিকে তুলে এনে গোপন সেলে বা বন্দিশালায় রেখে জিজ্ঞাসাবাদের সংস্কৃতি চালু হয়। তিনি উল্লেখ করেন, “তৎকালীন ডিজিএফআই এবং যৌথবাহিনী অনেক মন্ত্রী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গকে আটক করে। এমনকি বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানকেও তুলে এনে রিমান্ডের নামে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়। মূলত তখন থেকেই বেসামরিক নাগরিকদের যখন-তখন তুলে নেওয়া এবং আটক রাখা একটি অভ্যাসে পরিণত হয়। তারা ভাবতে শুরু করে, যে কাউকেই উঠিয়ে এনে যা ইচ্ছা তাই করা সম্ভব এবং এর জন্য তাদের কোনো জবাবদিহি করতে হবে না।”
সাবেক এই সেনাপ্রধান বলেন, এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি বা ‘ইমপিনিটি’ পরবর্তীতে জিয়াউল আহসানের মতো কর্মকর্তাদের দানবে পরিণত করতে সহায়তা করেছে।
জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া তার জবানবন্দিতে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের এক করুণ চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “জরুরি অবস্থার সময় সেনা সদস্যদের দীর্ঘদিনের লালিত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক পরিবর্তন আসে। তারা পরোক্ষভাবে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে এবং তাদের মধ্যে এক ধরনের আধিপত্যবোধের জন্ম হয়।”
তিনি আরও বলেন, “চেইন অব কমান্ড বা জ্যেষ্ঠ-কনিষ্ঠের সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ধরে এবং একটি বিভাজন সৃষ্টি হয়। এর ফলে বাহিনীতে ‘নগদ সংস্কৃতি’ বা অর্থবিত্তের প্রতি লোভের উত্থান ঘটে। পেশাদারিত্বের বদলে উপরস্থদের যেকোনো অবৈধ আদেশ অন্ধভাবে পালন করার প্রবণতা তৈরি হয়, যা একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর জন্য ছিল আত্মঘাতী।”
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরপরই পিলখানায় সংঘটিত বিডিআর বিদ্রোহ নিয়ে কথা বলেন সাবেক সেনাপ্রধান। তিনি বলেন, “২০০৯ সালে বিডিআর বিদ্রোহে ৫৭ জন মেধাবী সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ৭৪ জনকে হত্যা করা হয়। এটি ছিল সেনাবাহিনীর জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। কিন্তু বিদ্রোহ দমনের পর যা ঘটেছে, তাও ছিল মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।”
তিনি আদালতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (HRW) প্রতিবেদনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “বিদ্রোহ দমনের পর বিডিআর সদস্যদের গণহারে আটক করা হয় এবং পিলখানা সদর দপ্তরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু হয়। ওই জিজ্ঞাসাবাদকালীন সময়ে র্যাব ও সামরিক সদস্যদের দ্বারা পরিচালিত নির্মম নির্যাতনে আনুমানিক ৫০ জন বিডিআর সদস্য মৃত্যুবরণ করেন। হেফাজতে মৃত্যু বা কাস্টোডিয়াল ডেথ কোনো সভ্য সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”
তিনি উল্লেখ করেন, পরবর্তীতে ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলায় দায়রা আদালত ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৬১ জনকে যাবজ্জীবন এবং ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করে।
জবানবন্দির সবচেয়ে বিস্ফোরক অংশে জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া শেখ হাসিনার শাসনামলে সেনাবাহিনীকে পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করার অভিযোগ আনেন। তিনি বলেন, “বিডিআর বিদ্রোহের পর সেনা অফিসারদের একটি বড় অংশের মধ্যে ভারতবিরোধী ও আওয়ামী লীগ বিদ্বেষী মনোভাব তীব্রতর হয়। বাহিনীতে সিনিয়র ও জুনিয়র অফিসারদের মধ্যে বিভাজন ব্যাপক রূপ ধারণ করে।”
তিনি অভিযোগ করেন, “শেখ হাসিনা তার ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করতে পেশাদার ও দেশপ্রেমিক অফিসারদের একপাশে সরিয়ে দেন। তার বদলে দলীয়ভাবে অনুগত অফিসারদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করেন। শুধু তাই নয়, সেনাবাহিনীকে তাদের মূল কাজ বা জাতীয় প্রতিরক্ষা থেকে সরিয়ে বিভিন্ন জাতীয় প্রকল্প ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করা হয়। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল বাহিনীটিকে দুর্নীতিগ্রস্ত করা।”
জেনারেল ভূঁইয়া তার জবানবন্দিতে বলেন, “এর বড় কারণ হলো, শেখ হাসিনা ভাবতেন একটি দুর্নীতিগ্রস্ত সেনাবাহিনী তার জন্য নিরাপদ। যদি সেনা কর্মকর্তারা দুর্নীতি ও অর্থ উপার্জনে ব্যস্ত থাকে, তবে তারা কখনোই স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলবে না বা অভ্যুত্থানের চিন্তা করবে না।”
সাক্ষ্যগ্রহণের সময় কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন এনটিএমসি’র সাবেক মহাপরিচালক জিয়াউল আহসান। সাবেক সেনাপ্রধানের জবানবন্দিতে উঠে আসে যে, জিয়াউল আহসান ছিলেন সেই ব্যবস্থারই এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যারা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে গুম, খুন এবং নজরদারির মাধ্যমে ভয়ের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন।
আজকের এই জবানবন্দি ট্রাইব্যুনালের বিচারিক প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে। একজন সাবেক সেনাপ্রধান কর্তৃক অপর একজন সাবেক জেনারেল ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে এমন সরাসরি অভিযোগ বাংলাদেশের আইনি ইতিহাসে বিরল।
আগামী দিনে এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ অব্যাহত থাকবে বলে ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে।
