একদিকে আলোচনার আশা, অন্যদিকে যুদ্ধেরহুমকি, ইরানের কঠোর বার্তা ও নতুন নিষেধাজ্ঞার সমীকরণ

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে আবারও উত্তেজনা ও কূটনৈতিক তৎপরতার এক দ্বিমুখী স্রোত লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে যখন কূটনৈতিক আলোচনার টেবিলে বসার ইঙ্গিত মিলছে, অন্যদিকে চলছে পাল্টাপাল্টি সামরিক হুমকি ও নিষেধাজ্ঞার খেলা। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা খুব শিগগিরই আবার শুরু হবে বলে তিনি আশাবাদী। তবে এই আশাবাদের আড়ালে তেহরান তাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপস করবে না বলেও কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন।

গতকাল শনিবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে আব্বাস আরাগচি এ কথা বলেন। সাক্ষাৎকারের একটি ভিডিও ফুটেজ তিনি নিজের টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টেও প্রকাশ করেছেন, যা মুহূর্তের মধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।


ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, গত শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ওমানের রাজধানী মাসকাটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি ‘পরোক্ষ’ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই আলোচনাকে তিনি ‘একটি ভালো সূচনা’ হিসেবে অভিহিত করলেও সতর্ক করে দিয়েছেন যে, দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে আরও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। দীর্ঘদিনের বৈরিতা ও অবিশ্বাস একদিনের আলোচনায় দূর হওয়া সম্ভব নয়।

তবে মাসকাটের বৈঠকে কী নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো কী নিয়ে আলোচনা হয়নি। আরাগচি স্পষ্ট করে বলেন, “শুক্রবার ওমানে অনুষ্ঠিত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনায় তেহরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে কোনো দর-কষাকষি হয়নি। আমাদের প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কখনোই দর-কষাকষির বিষয় ছিল না এবং ভবিষ্যতেও হবে না।”


ইরান যে আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি, তা দুর্বলতার লক্ষণ নয়—এই বার্তাটি দিতে ভোলেননি আরাগচি। আগামী সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ওই বৈঠকে নেতানিয়াহু ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে লাগাম টানার বিষয়ে ট্রাম্পকে চাপ দিতে পারেন।

এই সম্ভাব্য কূটনৈতিক চাপের আগেই ইরান তাদের ‘রেড লাইন’ বা সীমারেখা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনো ভুল হিসাব-নিকাশ করে ইরানের ভূখণ্ডে আক্রমণ চালায় বা ইসরায়েলকে দিয়ে কোনো আগ্রাসন চালায়, তবে তেহরান চুপ করে বসে থাকবে না। সেক্ষেত্রে এ অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো আমাদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে।” এটি মূলত মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতিকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানানোর শামিল।


কূটনৈতিক আলোচনার সমান্তরালে সামরিক শক্তি প্রদর্শনের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার প্রধান দুই মার্কিন আলোচক স্টিভ উইটকফ এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জামাতা ও উপদেষ্টা জ্যারেড কুশনার আরব সাগরে অবস্থানরত মার্কিন বিমানবাহী রণতরি ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’ পরিদর্শন করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টে এই পরিদর্শনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। পারমাণবিক শক্তিচালিত এই রণতরিতে শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তাদের উপস্থিতি এবং পরিদর্শনকে ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপের বা মনস্তাত্ত্বিক চাপের অংশ হিসেবে দেখছেন সমরবিদেরা। কুশনারের উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ ইসরায়েলের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টি সর্বজনবিদিত। রণতরি থেকে ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করার এই কৌশল আলোচনার পরিবেশকে ঘোলাটে করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।


আল-জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও কথা বলেন আরাগচি। তিনি বলেন, “পারমাণবিক জ্বালানি সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম ইরানের ‘অখণ্ড অধিকার’। এটি আমাদের জাতীয় গর্ব ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির প্রতীক। এই কার্যক্রম অবশ্যই অব্যাহত থাকতে হবে।”

তবে তিনি এটাও উল্লেখ করেন যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো উদ্দেশ্য পোষণ করে না এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আশ্বস্ত করতে তারা প্রস্তুত। তিনি বলেন, “এই কার্যক্রম নিয়ে একটি আশ্বস্তকারী চুক্তিতে পৌঁছাতে আমরা প্রস্তুত রয়েছি। ইরানের পারমাণবিক ইস্যুর সমাধান শুধু আলোচনার মাধ্যমেই সম্ভব, বল প্রয়োগ বা নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে নয়।”


যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আচরণে আবারও তার চিরাচরিত ‘অনিশ্চয়তার’ ছাপ দেখা গেছে। গত শুক্রবার তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে, ইরান ইস্যুতে ওয়াশিংটন ‘খুব ভালো আলোচনা’ করেছে এবং ভবিষ্যতে আরও আলোচনার আশা প্রকাশ করেন। তার এই বক্তব্যে কূটনৈতিক সমাধানের ইঙ্গিত মিললেও, পরদিন শনিবার তিনি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

শনিবার ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে সই করেছেন, যার মাধ্যমে তেহরানের জ্বালানি তেল পরিবহন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও জাহাজের বিরুদ্ধে নতুন করে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য হলো ইরানের অর্থনীতির প্রাণভোমরা তেল রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করা। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্প প্রশাসন ‘সর্বোচ্চ চাপ’ (Maximum Pressure) প্রয়োগের নীতি বজায় রেখে ইরানকে আলোচনার টেবিলে নমনীয় করতে চাইছে। কিন্তু ইরানের প্রতিক্রিয়া বলছে, তারা চাপের মুখে নতি স্বীকার না করে বরং পাল্টা প্রতিরোধের পথ বেছে নিচ্ছে।


আগামী সপ্তাহে ট্রাম্প-নেতানিয়াহু বৈঠক এবং ওমানে চলমান পরোক্ষ আলোচনার ফলাফলের ওপর নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের আগামী দিনের পরিস্থিতি। ইরান একদিকে যেমন আলোচনার দরজা খোলা রেখেছে, অন্যদিকে নিজেদের ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক সক্ষমতাকে জাতীয় নিরাপত্তার রক্ষকবচ হিসেবে আঁকড়ে ধরে আছে।

যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসরায়েলের প্ররোচনায় বা নিজস্ব স্বার্থে সামরিক আগ্রাসনের পথ বেছে নেয়, তবে হরমুজ প্রণালী থেকে শুরু করে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ভয়াবহ সংঘাত ছড়িয়ে পড়তে পারে। আর যদি কূটনৈতিক পথ সফল হয়, তবে তা হবে একটি দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়ার শুরু। তবে আপাতত আব্বাস আরাগচির বক্তব্য এবং মার্কিন রণতরিতে তৎপরতা—উভয়ই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, শান্তি ও সংঘাতের এক সূক্ষ্ম সুতোর ওপর ঝুলে আছে দুই দেশের সম্পর্ক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন