গাজায় ‘শত্রু ভেবে’ নিজেদের গুলিতেই ইসরায়েলি সেনা নিহত

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় চলমান সংঘাতের মধ্যে এক মর্মান্তিক ও বিব্রতকর ঘটনার শিকার হয়েছে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ)। খান ইউনিসে অভিযান চালানোর সময় ‘শত্রু ভেবে’ ভুলবশত নিজেদের বাহিনীর গুলিতেই (ফ্রেন্ডলি ফায়ার) এক ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ঘোষিত যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরেও গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর এমন অভিযান এবং প্রাণহানির ঘটনা আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

আইডিএফ-এর প্রাথমিক তদন্ত প্রতিবেদন ও বিবৃতির বরাতে জানা গেছে, নিহত ওই সেনার নাম স্টাফ সার্জেন্ট ওফরি ইয়াফে (২১)। তিনি ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর অভিজাত প্যারাট্রুপারস ব্রিগেডের রিকনাইস্যান্স ইউনিটের (জরিপ ও বিশেষ অভিযান দল) সদস্য ছিলেন। তার বাড়ি ইসরায়েলের জেজরেল ভ্যালির হায়োগেভ নামক একটি মোশাভে (সমবায় গ্রাম)।

ঘটনাটি ঘটে বুধবার দিবাগত রাত আনুমানিক ২টার দিকে। প্যারাট্রুপারস ব্রিগেডের দুটি পৃথক দল গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর খান ইউনিসের ‘ইয়েলো লাইন’ বা নির্ধারিত সীমানার কাছে নিয়মিত তল্লাশি ও হামাসের সুড়ঙ্গ ধ্বংসের অভিযানে বের হয়। রাতের অন্ধকারে এবং জটিল নগর যুদ্ধের (Urban Warfare) পরিস্থিতির কারণে একপর্যায়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়। একটি দল ভুলবশত অন্য দলটিকে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধা বা হামাসের সদস্য মনে করে গুলিবর্ষণ শুরু করে।

এ সময় নিজেদের সহযোদ্ধাদের গুলিতে গুরুতর আহত হন স্টাফ সার্জেন্ট ওফরি ইয়াফে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপরই তাকে দ্রুত উদ্ধার করে উন্নত চিকিৎসার জন্য একটি সামরিক হেলিকপ্টারে করে হাসপাতালে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের কারণে হাসপাতালে পৌঁছানোর পথেই তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বলে সামরিক বাহিনী জানিয়েছে।

নিজ বাহিনীর গুলিতে সেনা নিহতের এই ঘটনাকে ‘অপারেশনাল দুর্ঘটনা’ হিসেবে অভিহিত করেছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। ঘটনার পরপরই আইডিএফ একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কীভাবে আধুনিক যোগাযোগ সরঞ্জাম থাকা সত্ত্বেও এমন ভুল শনাক্তকরণ (Misidentification) হলো এবং কেন যুদ্ধবিরতির প্রোটোকল মেনে চলা হলো না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ইসরায়েলি সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, গাজার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এলাকায় রাতে অভিযান চালানো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। সেখানে হামাস যোদ্ধারা গেরিলা কায়দাতে আক্রমণ করে থাকে, যার ফলে ইসরায়েলি সেনাদের মধ্যে সবসময় এক ধরনের স্নায়ুবিক চাপ কাজ করে। এই মানসিক চাপ থেকেই এমন ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’-এর ঘটনা ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে এখন পর্যন্ত মোট ৯২৫ জন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে গাজা উপত্যকার অভ্যন্তরে স্থল অভিযান চালাতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৪৭১ জন। ওফরি ইয়াফের মৃত্যু এই তালিকায় নতুন সংযোজন।

অন্যদিকে, গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি আগ্রাসনের চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। গত দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা (অক্টোবর ২০২৩ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৬) এই নির্বিচার হামলায় এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে সিংহভাগই নারী ও শিশু। এছাড়া আহত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন আরও ১ লাখ ৭১ হাজারের বেশি মানুষ। গাজার অধিকাংশ অবকাঠামো, হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক তৎপরতা ও মধ্যস্থতায় গত বছরের (২০২৫) ১০ অক্টোবর থেকে গাজায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর রয়েছে বলে দাবি করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, গাজার মাটিতে এই যুদ্ধবিরতি অনেকটাই কাগজ-কলমে সীমাবদ্ধ। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, ইসরায়েলি বাহিনী নিয়মিতভাবেই যুদ্ধবিরতির শর্ত লঙ্ঘন করে চলেছে।

পরিসংখ্যান বলছে, কথিত এই যুদ্ধবিরতি চলাকালীন সময়েই ইসরায়েলি বাহিনীর গোলাবর্ষণ, স্নাইপার হামলা এবং ঝটিকা অভিযানে ৬০৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এছাড়া আহত হয়েছেন আরও ১ হাজার ৬১৮ জন। খান ইউনিসে গত বুধবার রাতের ঘটনা প্রমাণ করে যে, যুদ্ধবিরতির কথা বলা হলেও ইসরায়েলি বাহিনী তাদের ‘হামাস নির্মূল’ অভিযানের নামে সামরিক তৎপরতা পুরোদমে চালিয়ে যাচ্ছে।

খান ইউনিসে নিজেদের গুলিতে ইসরায়েলি সেনা নিহতের ঘটনাটি যুদ্ধের বিশৃঙ্খলাকেই নির্দেশ করে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের ফলে ইসরায়েলি সেনাদের মধ্যে ক্লান্তি ও মনস্তাত্ত্বিক বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে, যার প্রতিফলন ঘটছে এমন অপেশাদার আচরণে। অন্যদিকে, যুদ্ধবিরতির মধ্যেও অভিযান চালানো এবং প্রাণহানি ঘটা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরানোর প্রক্রিয়ায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের মতে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতার সুযোগ নিয়ে ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা এবং জাতিগত নিধন অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধবিরতিকে তারা কেবল সময়ক্ষেপণ এবং আন্তর্জাতিক চাপ কমানোর কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে। ওফরি ইয়াফের মৃত্যু আবারও প্রমাণ করল যে, সংঘাত জিইয়ে রাখলে কেবল ফিলিস্তিনিরাই নয়, ইসরায়েলিরাও নিরাপদ নয়।

স্টাফ সার্জেন্ট ওফরি ইয়াফের শেষকৃত্য তার নিজ গ্রাম হায়োগেভে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছে তার পরিবার। অন্যদিকে, গাজার সাধারণ মানুষ প্রতি মুহূর্তে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। একদিকে খাদ্য ও চিকিৎসার অভাব, অন্যদিকে মাথার ওপর চক্কর দেওয়া ইসরায়েলি ড্রোন ও যুদ্ধবিমান—সব মিলিয়ে গাজা এখন এক মৃত্যু উপত্যকা। এই পরিস্থিতির কবে অবসান হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে খান ইউনিসের এই ঘটনা যুদ্ধের নির্মমতা এবং উভয় পক্ষের ক্ষয়ক্ষতির এক করুণ চিত্রই তুলে ধরেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন