বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নতুন সূচনা, মন্ত্রী হলেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক খলিলুর, প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার তাদের যাত্রা শুরু করেছে। শপথ গ্রহণের পরদিনই বুধবার (১৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের দপ্তর বণ্টন চূড়ান্ত করা হয়েছে। সবার দৃষ্টি নিবদ্ধ ছিল সরকারের অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দিকে। আর সেখানেই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেখালেন তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও অভিজ্ঞ কূটনীতিক খলিলুর রহমান। তার সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বিএনপির তরুণ ও ডাইনামিক নেত্রী, ফরিদপুর-২ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য শামা ওবায়েদ ইসলাম।

৫০ সদস্যের বিশাল এই মন্ত্রিসভায় অভিজ্ঞ পেশাজীবী এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের যে সমন্বয় ঘটানো হয়েছে, তা কূটনৈতিক পাড়ায় ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। বিশেষ করে টেকনোক্র্যাট কোটায় খলিলুর রহমানের মতো একজন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশারদকে পররাষ্ট্রের গুরুদায়িত্ব দেওয়া এবং তার সঙ্গে রাজনৈতিক মুখ হিসেবে শামা ওবায়েদকে রাখার বিষয়টি একটি ‘কৌশলগত ভারসাম্য’ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।


পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে খলিলুর রহমানের নিয়োগকে অনেকেই ‘চমক’ হিসেবে দেখলেও, আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি একটি সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। তিনি সরাসরি রাজনীতির মাঠের লোক না হলেও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও কূটনীতিতে তার দীর্ঘদিনের পদচারণা রয়েছে।

খলিলুর রহমান ২০২৪ সালের নভেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলি সংক্রান্ত ‘হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে তার জোরালো ভূমিকা প্রশংসিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের এপ্রিলে তাকে প্রধান উপদেষ্টার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই দীর্ঘ সময় তিনি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে কাজ করেছেন।

টেকনোক্র্যাট কোটায় তাকে মন্ত্রী করার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মূলত পররাষ্ট্রনীতিতে একটি ‘পেশাদার ধারাবাহিকতা’ বজায় রাখতে চেয়েছেন। রাজনৈতিক সরকারের পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি যাতে কোনো হঠকারী সিদ্ধান্তের শিকার না হয়, সে কারণেই খলিলুর রহমানের মতো একজন ‘সেফ হ্যান্ড’ বা নির্ভরযোগ্য ব্যক্তির ওপর আস্থা রাখা হয়েছে। বিশেষ করে ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখা এবং রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে তার অভিজ্ঞতা ট্রাম্পকার্ড হিসেবে কাজ করবে।


অন্যদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শামা ওবায়েদ ইসলামের নিয়োগ বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মী এবং আন্তর্জাতিক উইংয়ের জন্য বড় প্রাপ্তি। ফরিদপুর-২ (সালথা-নগরকান্দা) আসন থেকে নির্বাচিত এই সংসদ সদস্য বিএনপির সাবেক মহাসচিব মরহুম কে এম ওবায়দুর রহমানের কন্যা। বাবার রাজনৈতিক আদর্শ ধারণ করে তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

তবে শামা ওবায়েদের পরিচিতি কেবল সাংগঠনিক দক্ষতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গত দেড় দশক ধরে বিএনপির ফরেইন অ্যাফেয়ার্স কমিটির (FAC) অন্যতম সক্রিয় সদস্য হিসেবে তিনি কাজ করেছেন। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যখন বিএনপির ওপর দমন-পীড়ন চলছিল, তখন আন্তর্জাতিক মহলে দলের অবস্থান তুলে ধরা, বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা এবং লবিংয়ের ক্ষেত্রে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি হিসেবে তিনি মন্ত্রণালয়ের কাজে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটাবেন বলে মনে করা হচ্ছে। খলিলুর রহমানের টেকনিক্যাল জ্ঞান এবং শামা ওবায়েদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা—এই দুইয়ের সমন্বয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নতুন গতি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে।


মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় এক আড়ম্বরপূর্ণ অনুষ্ঠানে শপথ নেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার মন্ত্রিসভার সদস্যরা। মোট ৫০ সদস্যের এই মন্ত্রিসভায় ২৫ জন পূর্ণমন্ত্রী এবং ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী রয়েছেন।

মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভারসাম্য, দলের ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন এবং পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ছাড়াও অর্থ, স্বরাষ্ট্র ও আইন মন্ত্রণালয়েও বেশ কিছু চমকপ্রদ নিয়োগ দেখা গেছে। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একজন অনির্বাচিত বিশেষজ্ঞ (টেকনোক্র্যাট) এবং একজন নির্বাচিত রাজনীতিকের (প্রতিমন্ত্রী) এই ‘হাইব্রিড মডেল’ বা মিশ্র কাঠামোটি সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে।


আজ বুধবার থেকেই নবনিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী তাদের দপ্তরে আনুষ্ঠানিকভাবে কাজ শুরু করবেন। তাদের সামনে অপেক্ষা করছে পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা, মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার রক্ষা, এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন ও সীমান্ত হত্যা বন্ধের মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলো তাদের মোকাবিলা করতে হবে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মারুফ মল্লিক বলেন, “তারেক রহমান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাজানোর ক্ষেত্রে যে পরিপক্বতার পরিচয় দিয়েছেন, তা প্রশংসনীয়। খলিলুর রহমান আন্তর্জাতিক রীতিনীতি ও প্রটোকল ভালো বোঝেন, অন্যদিকে শামা ওবায়েদ দলের ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন করবেন। এই ডুও (জুটি) যদি সফলভাবে সমন্বয় করে কাজ করতে পারে, তবে বাংলাদেশের কূটনীতি এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছাবে।”

শপথ নেওয়ার পর থেকেই নতুন বাংলাদেশকে বিশ্বমঞ্চে মর্যাদাপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত করার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী। সেই লক্ষ্য অর্জনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই নতুন নেতৃত্ব কতটুকু সফল হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন