নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় এক গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিন ধরে স্থানীয় রাজনীতি এবং জাতীয় অঙ্গন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। ঘটনার তিন দিন পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত থানায় বা আদালতে ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের করা হয়নি। তবে ঘটনার সংবেদনশীলতা বিবেচনায় পুলিশ প্রশাসন স্বপ্রণোদিত হয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে এবং সেই জিডির সূত্র ধরেই ভুক্তভোগীর শারীরিক পরীক্ষার জন্য তিন সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই মেডিকেল বোর্ড গঠন করে এবং ভুক্তভোগীর প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ সম্পন্ন করেছে। এদিকে, এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি রাজনৈতিক বক্তব্য, অভিযুক্তের অবস্থান নিয়ে সিসিটিভি ফুটেজের প্রমাণ এবং ছাত্রসংগঠনগুলোর মধ্যে কাদা-ছোড়াছুড়িতে পরিস্থিতি এক জটিল আকার ধারণ করেছে।
ধর্ষণের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী সোমবার বিকেলে নিশ্চিত করেন যে, পুলিশের চাহিদাপত্র অনুযায়ী তিন সদস্যের মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। পুলিশ কোনো মামলা না হলেও জিডি মূলে এই চাহিদাপত্র পাঠায়, যার ভিত্তিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নেয়।
মেডিকেল বোর্ডের সদস্যরা হলেন—গাইনি বিশেষজ্ঞ ডা. শিরিন সুলতানা, ডা. ফাতেমা জোহরা মুনিয়া এবং ডা. তাহমিনা আক্তার। ডা. ফরিদ উদ্দিন চৌধুরী জানান, ভুক্তভোগীর প্রাথমিক শারীরিক পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে এবং ডিএনএ পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল হাতে পাওয়ার পর আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে কমিটি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এই প্রতিবেদনই ঘটনার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঘটনার তিন দিন অতিবাহিত হলেও ভুক্তভোগী কিংবা তার পরিবারের পক্ষ থেকে হাতিয়া থানায় কোনো লিখিত এজাহার দায়ের করা হয়নি। হাতিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সাইফুল আলম জানান, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। সেখানে হামলা, ভাঙচুর এবং মারধরের আলামত পাওয়া গেলেও ধর্ষণের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে পুলিশ বিষয়টিকে হালকাভাবে নিচ্ছে না।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) আবু তৈয়ব মো. আরিফ হোসেন জানিয়েছেন, ভুক্তভোগী নারী অভিযোগ না দিলেও তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সার্বক্ষণিক পাহারা বসিয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে স্বপ্রণোদিত জিডি করে আইনি প্রক্রিয়া চলমান রাখা হয়েছে, যাতে সত্য উদঘাটিত হয়।
ভুক্তভোগী ওই নারীর স্বামী সাংবাদিকদের কাছে অভিযোগ করেন যে, গত শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) রাত ১১টার পর স্থানীয় একদল সন্ত্রাসী তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। সন্ত্রাসীরা তাকে স্কচটেপ দিয়ে মুখ বেঁধে এবং মারধর করে আটকে রাখে। তার অভিযোগ, রাত দুইটার দিকে তার স্ত্রী তাকে জানান যে, হামলাকারীদের মধ্যে রহমান হোসেন নামের এক ব্যক্তি তাকে পাশের গোসলখানায় নিয়ে ধর্ষণ করেছে।
এর আগে শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) ওই নারী নোয়াখালী জেনারেল হাসপাতালে প্রথমে মারধরের চিকিৎসা নেন। পরে বিকেলে তিনি পুনরায় হাসপাতালে গিয়ে দাবি করেন, নির্বাচনে ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে ভোট দেওয়ায় তাকে এবং তার স্বামীকে মারধর করা হয়েছে এবং রহমান হোসেন তাকে ধর্ষণ করেছেন। বর্তমানে তিনি হাসপাতালের গাইনি বিভাগে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
ঘটনার মূল অভিযুক্ত রহমান হোসেনকে নিয়ে নতুন এক রহস্যের জন্ম হয়েছে। ভুক্তভোগীর দাবিকৃত ঘটনার সময় (শুক্রবার রাত ১১টা থেকে ১২টা) রহমান হোসেনের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে হাসপাতাল সূত্র। জেনারেল হাসপাতালের রেকর্ড অনুযায়ী, রহমান হোসেন শুক্রবার রাত সাড়ে ১০টায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং ১০টা ৪০ মিনিটে মোটরসাইকেল যোগে হাসপাতাল ত্যাগ করেছেন। জরুরি বিভাগের রেজিস্ট্রার খাতা এবং সিসিটিভি ফুটেজে তার উপস্থিতির প্রমাণ সংরক্ষিত আছে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করেছে। এই তথ্য যদি সত্য হয়, তবে হাতিয়ার দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থা বিবেচনায় এত অল্প সময়ে তার পক্ষে অপরাধস্থলে উপস্থিত থাকা সম্ভব কি না, তা নিয়ে তদন্ত চলছে।
এই ঘটনাটি দ্রুত রাজনৈতিক রূপ লাভ করেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান এবং ফরিদা আকতার ভুক্তভোগীর খোঁজখবর নিয়েছেন। এছাড়া জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামও টেলিফোনে ওই নারীর সঙ্গে কথা বলে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছিলেন।
তবে ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা এবং তথ্যের গরমিল থাকায় সোমবার জামায়াতের আমির ও এনসিপি আহ্বায়কের নোয়াখালী সফর অনিবার্য কারণবশত বাতিল করা হয়েছে। অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টির জেলা কমিটি প্রথমে বিক্ষোভ কর্মসূচির ডাক দিলেও পরবর্তীতে তা স্থগিত ঘোষণা করে।
এই অভিযোগকে একটি রাজনৈতিক চক্রান্ত হিসেবে দেখছে বিএনপি। নোয়াখালী জেলা বিএনপি সোমবার বিকেলে এক বিবৃতিতে দাবি করেছে, এটি একটি নিছক সমসাময়িক ঘটনাকে ধর্ষণের ঘটনায় রূপান্তরের মাধ্যমে বিএনপিকে হেয় করার গভীর ষড়যন্ত্র। জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মাহবুব আলমগীর আলো ও সদস্য সচিব হারুনুর রশিদ আজাদ স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, হাতিয়ায় বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মী ও সংখ্যালঘুর বাড়িতে হামলা হলেও তা নিয়ে কেউ কথা বলছে না। তারা গণতান্ত্রিক রায় মেনে সবাইকে ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানান।
অন্যদিকে, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তিনি দাবি করেন, ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর বিষয়কে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি এনসিপির হান্নান মাসউদ, আসিফ মাহমুদ এবং ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েমসহ সংশ্লিষ্টদের জাতির কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানান। তার মতে, সত্যতা যাচাই না করে ‘মব’ তৈরি করার এই অপচেষ্টা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য বিপজ্জনক।
হাতিয়ার এই ঘটনাটি এখন কেবল একটি ফৌজদারি অভিযোগেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি জাতীয় রাজনীতির এক নতুন মেরুকরণের জন্ম দিয়েছে। একদিকে ভুক্তভোগীর গুরুতর অভিযোগ, অন্যদিকে সিসিটিভি ফুটেজে অভিযুক্তের ভিন্ন অবস্থানের প্রমাণ—সব মিলিয়ে ঘটনাটি এক গোলকধাঁধায় আটকে আছে। মেডিকেল বোর্ডের রিপোর্ট এবং পুলিশি তদন্ত শেষেই হয়তো বেরিয়ে আসবে প্রকৃত সত্য। তবে ততদিন পর্যন্ত এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নোয়াখালীর রাজনীতি যে উত্তপ্ত থাকবে, তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
