রামুতে সিনেমার স্টাইলে ধাওয়া, নম্বরবিহীন ট্রাক থেকে দেড় লাখ ইয়াবা উদ্ধার

কক্সবাজারের পর্যটন ও সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে পরিচিত এই অঞ্চলে মাদক কারবারিদের দৌরাত্ম্য রুখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর অবস্থানের মধ্যেও থেমে নেই পাচারকারীদের নিত্যনতুন কৌশল। তবে এবার পুলিশের তৎপরতায় ভেস্তে গেছে একটি বড় মাদকের চালান। কক্সবাজারের রামুতে সিনেমার দৃশ্যের মতো ধাওয়া করে একটি নম্বরবিহীন মিনি ট্রাক থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার করেছে জেলা পুলিশ। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) রাতে পরিচালিত এই শ্বাসরুদ্ধকর অভিযানে প্রায় দেড় লাখ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়, যার আনুমানিক বাজারমূল্য কোটি টাকারও বেশি। এই ঘটনায় ট্রাকচালক ও মাদক পাচারকারী মোহাম্মদ হারুনকে (২৯) গ্রেপ্তার করা হয়েছে।


পুলিশ সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই মাদক পাচারকারীরা কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ এবং ভেতরের গ্রামীণ সড়কগুলো ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ইয়াবা পাচার করে আসছে। মঙ্গলবার রাতে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিএসবি) গোপন সংবাদের মাধ্যমে জানতে পারে যে, একটি চক্র বড় একটি ইয়াবার চালান নিয়ে মরিচ্যা এলাকা থেকে রামুর দিকে আসছে। পাচারকারীরা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিতে নম্বরবিহীন একটি মিনি ট্রাক ব্যবহার করছে—এমন সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার পরপরই নড়েচড়ে বসে পুলিশ প্রশাসন।


তথ্য পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই রামুর শিকলঘাটা ব্রিজের দক্ষিণ পাশে মরিচ্যা-রামু সড়কে তাৎক্ষণিক একটি অস্থায়ী চেকপোস্ট বসায় পুলিশ। রাত তখন গভীর। পুলিশ সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে থেকে প্রতিটি সন্দেহভাজন যানবাহনে তল্লাশি চালাচ্ছিলেন। এ সময় একটি নম্বরবিহীন মিনি ট্রাক চেকপোস্টের দিকে এগিয়ে আসে। পুলিশ ট্রাকটিকে থামার সংকেত দেয়। কিন্তু চালক ট্রাকটি না থামিয়ে উল্টো গতি বাড়িয়ে চেকপোস্টের ব্যারিয়ার ভেঙে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।

মুহূর্তের মধ্যে শুরু হয় পুলিশের ধাওয়া। রাতের অন্ধকারে মিনি ট্রাকটি বেপরোয়া গতিতে ছুটতে থাকে, আর তার পিছু নেয় পুলিশের টহল গাড়ি। দীর্ঘক্ষণ ধাওয়া করার পর ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের রামু কেন্দ্রীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে গিয়ে ট্রাকটি আটকা পড়ে। এ সময় চালক গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে পুলিশ সদস্যরা তাকে ঘেরাও করে ফেলে এবং হাতে-নাতে আটক করতে সক্ষম হয়।


আটককৃত ব্যক্তির নাম মোহাম্মদ হারুন। তিনি রামু উপজেলার খুনিয়াপালং ইউনিয়নের পূর্ব দারিয়ারদিঘী গ্রামের হোসেন আহমদের ছেলে। আটকের সময় হারুনের হাতে একটি বড় সাদা প্লাস্টিকের বস্তা ছিল। পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতিতে ওই বস্তাটি তল্লাশি করা হয়। বস্তার ভেতরে বিশেষ কায়দায় মোড়ানো ১৫টি প্যাকেট পাওয়া যায়। প্রতিটি প্যাকেটে ১০ হাজার করে মোট ১ লাখ ৫০ হাজার পিস ইয়াবা পাওয়া যায়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হারুন স্বীকার করেছেন যে, তিনি এই চালানটি চট্টগ্রাম ও ঢাকার দিকে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। নম্বরবিহীন গাড়ি ব্যবহারের কারণ হিসেবে তিনি জানান, যাতে সিসিটিভি ফুটেজ বা রাস্তার চেকপোস্টে গাড়িটি সহজে শনাক্ত করা না যায়।


এই সফল অভিযানের বিষয়ে মঙ্গলবার রাত ১১টার দিকে গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) অলক বিশ্বাস। তিনি ইটিসি বাংলাকে বলেন, “আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য ছিল যে, একটি বড় মাদকের চালান এই রুট ব্যবহার করে পাচার হতে যাচ্ছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই আমরা চেকপোস্ট বসাই। পাচারকারীরা পালানোর চেষ্টা করলেও আমাদের চৌকস অফিসাররা তাদের ধরে ফেলে। উদ্ধারকৃত ইয়াবার পরিমাণ দেড় লাখ, যা সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ধার হওয়া বড় চালানগুলোর একটি।”

তিনি আরও বলেন, “মাদক পাচারকারীরা এখন নিত্যনতুন কৌশল অবলম্বন করছে। কখনো ফলের গাড়িতে, কখনো রোগী সেজে, আবার কখনো নম্বরবিহীন গাড়ি ব্যবহার করে তারা পাচার কাজ চালাচ্ছে। তবে পুলিশও তাদের কৌশল নস্যাৎ করতে বদ্ধপরিকর। কক্সবাজারকে মাদকমুক্ত করতে আমাদের এই অভিযান অব্যাহত থাকবে।”


রামুর স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মরিচ্যা-রামু সড়কটি সম্প্রতি মাদক পাচারের একটি নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মূল মহাসড়কে কড়াকড়ি থাকায় পাচারকারীরা এই বাইপাস সড়কগুলো বেছে নিচ্ছে। স্থানীয় সমাজকর্মী ও সচেতন নাগরিকরা পুলিশের এই অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছেন। তারা বলছেন, দেড় লাখ ইয়াবা যদি দেশের যুবসমাজে ছড়িয়ে পড়ত, তবে তা ভয়াবহ ক্ষতির কারণ হতো।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “রাতে হঠাৎ পুলিশের সাইরেন আর গাড়ির শব্দে আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম। পরে শুনলাম ইয়াবা ধরা পড়েছে। আমরা চাই পুলিশ যেন এভাবেই সক্রিয় থাকে। কারণ, এই মাদক আমাদের এলাকার যুবকদের ধ্বংস করে দিচ্ছে।”


উদ্ধারকৃত ইয়াবার আনুমানিক বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা। এ ঘটনায় রামু থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত হারুন শুধুই একজন বাহক নাকি এই চালানের মূল মালিক, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করলে এই চক্রের গডফাদারদের নাম বেরিয়ে আসবে বলে আশা করছে পুলিশ। এছাড়া জব্দকৃত নম্বরবিহীন মিনি ট্রাকটি কার, তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।


কক্সবাজার জেলা পুলিশ সুপার এর আগেও ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করবে। মঙ্গলবার রাতের এই অভিযান সেই প্রতিশ্রুতিরই প্রতিফলন। সীমান্তে বিজিবি এবং অভ্যন্তরে পুলিশের কঠোর নজরদারি সত্ত্বেও ইয়াবা পাচার পুরোপুরি বন্ধ না হলেও, এ ধরনের বড় চালান আটক হওয়া নিঃসন্দেহে মাদক সিন্ডিকেটের জন্য একটি বড় ধাক্কা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আশা করছে, হারুনকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের একটি বড় মাদক সিন্ডিকেটের সন্ধান মিলবে। তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, পাচারকাজে ব্যবহৃত গাড়ির মালিক এবং এই চালানের গন্তব্যস্থল খুঁজে বের করাই এখন তাদের মূল লক্ষ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন