দীর্ঘ দুই দশকের প্রতীক্ষা, আন্দোলন, সংগ্রাম আর চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে রাষ্ট্রক্ষমতার মসনদে ফিরছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২০৯টি আসনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর এখন দেশজুড়ে একটাই আলোচনা—কেমন হচ্ছে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভা? কারা পাচ্ছেন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর দপ্তর? প্রবীণ ও ত্যাগী নেতাদের নাকি তরুণ ও প্রযুক্তিজ্ঞানসম্পন্ন মুখদের প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে?
আগামীকাল মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জমকালো শপথ অনুষ্ঠানের আগে এই প্রশ্নগুলোই এখন টক অব দ্য কান্ট্রি। তবে বিস্ময়কর বিষয় হলো, সরকার গঠনের মাত্র ২৪ ঘণ্টা বাকি থাকলেও মন্ত্রিসভার সদস্যদের তালিকা এখনো কাকপক্ষীতেও জানে না। দলের নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো ইটিসি বাংলাকে নিশ্চিত করেছে, মন্ত্রিসভার চূড়ান্ত তালিকাটি বিএনপি চেয়ারম্যান ও হবু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একান্ত নিজস্ব ‘সিক্রেট ফাইল’-এ সংরক্ষিত রয়েছে, যা কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে রক্ষা করা হচ্ছে।
বিএনপির রাজনীতিতে অতীতে দেখা গেছে, মন্ত্রিসভা গঠনের আগে সিনিয়র নেতাদের মধ্যে আলোচনা ও দরকষাকষির সুযোগ থাকত। কিন্তু এবার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। দলীয় সূত্রমতে, তারেক রহমান এবার মন্ত্রিসভা গঠনের ক্ষেত্রে ‘সারপ্রাইজ’ বা চমক দেওয়ার নীতি গ্রহণ করেছেন। তিনি দলের স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্যের সঙ্গেও আনুষ্ঠানিক কোনো বৈঠক বা আলোচনা করেননি।
জানা গেছে, মাত্র দু-একজন অতি বিশ্বাসভাজন ও সিনিয়র নেতার সঙ্গে তিনি পরামর্শ করেছেন বটে, কিন্তু তারাও এককভাবে চেয়ারম্যানকেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। ফলে মন্ত্রিসভার তালিকায় কার নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে বা কার নাম বাদ পড়েছে, তা জানার সুযোগ আপাতত কারও নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, তারেক রহমানের এই কঠোর গোপনীয়তা বজায় রাখার পেছনে প্রধান কারণ হলো—লবিং বা তদবির সংস্কৃতিকে নিরুৎসাহিত করা এবং একটি পেশাদার, দক্ষ ও জনবান্ধব প্রশাসন উপহার দেওয়া। দীর্ঘদিনের ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটির ভেতরে যাতে পদ-পদবি নিয়ে শেষ মুহূর্তে কোনো কোন্দল বা মনোমালিন্য সৃষ্টি না হয়, সেজন্যই এই ‘সিক্রেট ফাইল’ তত্ত্ব।
নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্ভাব্য মন্ত্রী ও তাদের দপ্তরের একাধিক তালিকা ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমনকি কিছু মূলধারার গণমাধ্যমেও সম্ভাব্য মন্ত্রীদের নাম নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। তবে বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এসব তালিকাকে ‘সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন’ ও ‘মনগড়া’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
দলের গুলশান কার্যালয়ের একটি সূত্র জানায়, ইন্টারনেটে যেসব তালিকা দেখা যাচ্ছে, তার সঙ্গে বাস্তবের মিল থাকার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ, চেয়ারম্যান তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে যাচাই-বাছাই করে, প্রতিটি প্রার্থীর অতীত রেকর্ড, দলের প্রতি ত্যাগ এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বিবেচনা করে তালিকা চূড়ান্ত করেছেন। টেকনোক্র্যাট কোটায় কাদের রাখা হচ্ছে, সে বিষয়েও বাইরে কোনো তথ্য ফাঁস হয়নি।
প্রকাশ্যে কেউ কিছু না বললেও বিএনপির নবনির্বাচিত এমপিদের মধ্যে মন্ত্রী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা তীব্র। দলের একটি বড় অংশ ব্যক্তিগতভাবে নিজেদের যোগ্য মনে করছেন এবং মন্ত্রী হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন। তবে সরাসরি তারেক রহমানের কাছে গিয়ে কিছু বলার সাহস বা সুযোগ—কোনোটিই কারও নেই।
ফলে প্রার্থীরা ভিন্ন কৌশল বেছে নিয়েছেন। তাঁরা দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রভাবশালী সিনিয়র নেতাদের বাসায় বা অফিসে গিয়ে ভিড় করছেন। সেখানে তাঁরা নিজেদের অতীতের আন্দোলন-সংগ্রামের অবদান, ওয়ান-ইলেভেন পরবর্তী সময়ে দলের দুঃসময়ে ভূমিকা এবং রাজনৈতিক কারণে জেল-জুলুম ও নির্যাতনের ফিরিস্তি তুলে ধরছেন। তবে সিনিয়র নেতারাও তাঁদের কেবল ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিচ্ছেন এবং জানাচ্ছেন যে, সিদ্ধান্তটি সম্পূর্ণই চেয়ারম্যানের এখতিয়ার।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নবনির্বাচিত এমপি ইটিসি বাংলাকে বলেন, ‘‘গত ১৫-১৬ বছর ধরে মামলা আর হামলার শিকার হয়েছি। আশা করি দল তার মূল্যায়ন করবে। তবে তারেক ভাই যা ভালো মনে করবেন, সেটাই মেনে নেব।’’
মন্ত্রিসভার এই অস্পষ্টতা নিয়ে দলের শীর্ষ নেতাদের মধ্যেও এক ধরনের ধোঁয়াশা কাজ করছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সিরাজগঞ্জ-২ আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে এই গোপনীয়তার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
মন্ত্রিসভায় কারা আসছেন—এমন প্রশ্নের জবাবে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘‘সত্যি কথা বলতে, মন্ত্রিসভায় কারা থাকছেন, সেই তথ্য আমার জানা নেই। এখন পর্যন্ত (সোমবার দুপুর) আমাকে এ বিষয়ে কোনো ফোন দেওয়া হয়নি বা কিছু জানানো হয়নি। সংবাদমাধ্যমে যেসব তালিকা বা নাম দেখছি, সেগুলো আমার কাছে অনুমাননির্ভর বলেই মনে হচ্ছে।’’
দলের অন্যতম নীতিনির্ধারক হিসেবে পরিচিত টুকুর এই মন্তব্য প্রমাণ করে যে, তারেক রহমান কতটা গোপনীয়তার সঙ্গে তাঁর টিম সাজিয়েছেন। সাধারণত শপথের আগের দিন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে হবু মন্ত্রীদের ফোন করে গাড়ি প্রস্তুত রাখার কথা বলা হয়। আজ বিকেল বা সন্ধ্যার পর সেই কাঙ্ক্ষিত ফোনকলগুলো আসতে শুরু করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, তারেক রহমান তাঁর প্রথম মেয়াদের প্রধানমন্ত্রীত্বে একটি শক্তিশালী ও কার্যকর মন্ত্রিসভা গঠন করতে চাইবেন। সেক্ষেত্রে প্রবীণ ও অভিজ্ঞ নেতাদের পাশাপাশি উচ্চশিক্ষিত, ক্লিন ইমেজধারী তরুণ নেতা এবং টেকনোক্র্যাট কোটায় বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের স্থান পাওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে।
দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক জোরদার করার লক্ষ্যে অর্থ, স্বরাষ্ট্র, আইন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে বড় ধরনের চমক থাকতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত নেতাদের পাশাপাশি জুলাই আন্দোলনের চেতনার প্রতিফলনও দেখা যেতে পারে এই মন্ত্রিসভায়।
সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটতে যাচ্ছে আগামীকাল মঙ্গলবার বিকেল ৪টায়। জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন যখন নতুন মন্ত্রীদের শপথবাক্য পাঠ করাবেন, তখনই উন্মোচিত হবে তারেক রহমানের সেই ‘সিক্রেট ফাইল’।
দীর্ঘ দুই দশক পর ক্ষমতায় ফেরা বিএনপির জন্য এই মন্ত্রিসভা শুধু একটি সরকার গঠন নয়, বরং আগামীর বাংলাদেশ গড়ার রূপরেখা বাস্তবায়নের হাতিয়ার। এখন দেখার বিষয়, তারেক রহমানের এই গোপনীয়তার চাদর সরিয়ে কারা হাসেন বিজয়ের হাসি, আর কারা পান দেশ পরিচালনার গুরুদায়িত্ব। ইটিসি বাংলা আগামীকালকের শপথ অনুষ্ঠানের প্রতিটি মুহূর্ত এবং মন্ত্রিসভার পূর্ণাঙ্গ তালিকা সবার আগে পাঠকদের সামনে তুলে ধরবে।
