চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার বড় উঠান ইউনিয়ন পুনরায় রাজনৈতিক সহিংসতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার জের ধরে শুক্রবার রাতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর যুব ও ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ও আকস্মিক হামলায় যুবদল ও ছাত্রদলের অন্তত আটজন নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন। অন্যদিকে, পাল্টা হামলার ঘটনায় জামায়াতে ইসলামীর যুব সংগঠনের এনাম নামের এক কর্মীও আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পবিত্র মাহে রমজানের রাতে এমন সহিংসতায় পুরো এলাকাজুড়ে চরম আতঙ্ক ও থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্র ও ইটিসি বাংলার অনুসন্ধানে জানা যায়, এই সংঘাতের বীজ রোপিত হয়েছিল গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন। ওই দিন উপজেলার দৌলতপুর দীঘিরপাড় ৩ নং ওয়ার্ড ভোটকেন্দ্রে ভোটগ্রহণ চলাকালীন সময়ে এক হিন্দু ভোটারকে কেন্দ্র করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ রয়েছে, জামায়াতে ইসলামীর এক কর্মী ওই হিন্দু ভোটারকে মারধর করেন। বিষয়টির প্রতিবাদ করতে গেলে ভোটকেন্দ্রেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র তর্কবিতর্ক ও কথাকাটাকাটি হয়। স্থানীয় প্রবীণ নেতৃবৃন্দ ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপে তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি মীমাংসা হয়েছে বলে মনে করা হলেও, ভেতরে ভেতরে উভয় পক্ষের মধ্যে চরম চাপা ক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করছিল। তারই চূড়ান্ত ও সহিংস বহিঃপ্রকাশ ঘটে শুক্রবার রাতে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, শুক্রবার পবিত্র তারাবির নামাজের পর উপজেলার বড় উঠান ফাজিল খাঁর হাট এলাকায় এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়। অভিযোগ উঠেছে যে, দৌলতপুর জামে মসজিদে নামাজ পড়তে গেলে স্থানীয় জামায়াতের যুব সংগঠনের সেক্রেটারি মো. আলমগীরের নেতৃত্বে একটি সশস্ত্র দল পূর্বপরিকল্পিতভাবে যুবদল ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। হামলাকারীদের হাতে রামদা, কিরিচ, লোহার রড ও দেশীয় লাঠিসোঁটা ছিল বলে দাবি করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।
এই অতর্কিত ও ভয়াবহ হামলায় যারা গুরুতর আহত হয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন উপজেলা যুবদলের প্রভাবশালী সদস্য শাহেদুল আলম টিটু, বড় উঠান ইউনিয়ন কৃষক দলের সক্রিয় সদস্য মঞ্জুর আলম, ছাত্রদল নেতা মো. ইমন, যুবদল নেতা মো. ফারুক, মানিক, ছাত্রদল নেতা মো. রিয়াদ এবং মো. রাকিবসহ আরও বেশ কয়েকজন। অপরদিকে, আত্মরক্ষার্থে বা পাল্টা হামলার সময় এনাম নামে জামায়াতের যুব সংগঠনের এক কর্মীও আঘাতপ্রাপ্ত হন।
সংঘর্ষের পর মুহূর্তেই পুরো ফাজিল খাঁর হাট এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। স্থানীয় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে দিগ্বিদিক ছুটতে শুরু করেন। রক্তাক্ত অবস্থায় আহত নেতাকর্মীদের উদ্ধার করে দ্রুত পার্শ্ববর্তী আনোয়ারা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসকরা তাদের প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। তবে ধারালো অস্ত্রের আঘাতে অন্তত তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায়, উন্নত ও নিবিড় চিকিৎসার জন্য রাতেই তাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে তারা সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং হাসপাতালের পরিবেশেও এক ধরনের চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।
এই ন্যক্কারজনক হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে রাতেই কর্ণফুলী উপজেলার রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ফাজিল খাঁর হাটের পিএবি সড়কে বিএনপি, যুবদল ও ছাত্রদলের শতাধিক নেতাকর্মী একত্রিত হয়ে একটি বিশাল প্রতিবাদ মিছিল বের করেন। তারা হামলাকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে কর্ণফুলী জোন সহকারী কমিশনার (এসপি) ও পুলিশ প্রশাসনের একটি বড় দল দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসে এবং পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনে।
তবে উত্তেজনা সেখানেই থেমে থাকেনি। রাত ১২টার পর মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রথম প্রহরে স্থানীয় শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন ও পুষ্পস্তবক অর্পণ করতে আসেন বিএনপি ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। ফুল দেওয়ার পর ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা কর্ণফুলী উপজেলা পরিষদের সামনের প্রধান সড়ক অবরোধ করে অবস্থান ধর্মঘট শুরু করেন। তাদের দাবি, রাতের অন্ধকারে যারা এই কাপুরুষোচিত হামলা চালিয়েছে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। এ ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এবং সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে আজ (শনিবার) দুপুর ২টায় কর্ণফুলী উপজেলা বিএনপি এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশের ডাক দিয়েছে।
এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনায় উভয় দলের নেতারাই একে অপরের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন। দক্ষিণ জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সদস্য এস এম ফারুক হোসেন ইটিসি বাংলাকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘সংসদ নির্বাচনে হিন্দুপাড়ার ভোটকেন্দ্রে সর্বোচ্চ ভোটারের উপস্থিতি দেখে জামায়াতের নেতাকর্মীরা ঈর্ষান্বিত হয়ে পরিকল্পিতভাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছিল। সেই ঘটনার রেশ ধরে শুক্রবার রাতে আমাদের স্থানীয় যুবদল ও ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মী দৌলতপুর জামে মসজিদে তারাবির নামাজ পড়তে গেলে, জামায়াতের যুব সংগঠনের সেক্রেটারির নেতৃত্বে তাদের ওপর বর্বরোচিত হামলা করা হয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে তাদের সামনেই জামায়াতের সন্ত্রাসীরা আমাদের কর্মীদের রামদা, কিরিচ আর লাঠিসোঁটা দিয়ে বেধড়ক মারধর করে। এ ঘটনায় আমরা তীব্র নিন্দা ও ধিক্কার জানাচ্ছি। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তারের জোর দাবি জানাচ্ছি আমরা।’
অন্যদিকে, এই হামলার অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে কর্ণফুলী উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির তাদের নিজস্ব অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি ইটিসি বাংলাকে বলেন, ‘নির্বাচনের দিন একটি ভোটকেন্দ্রে এক হিন্দু ছেলের সঙ্গে মামুন নামে আমাদের এক কর্মীর সামান্য কথাকাটাকাটি হয়েছিল। স্থানীয়ভাবে তখনই বিষয়টি মিটমাট হয়ে যায়। কিন্তু শুক্রবার রাতে যুবদলের টিটু নামের এক নেতার নেতৃত্বে ৫০-৬০ জনের একটি সংঘবদ্ধ দল সম্পূর্ণ বিনা প্ররোচনায় মামুনের বাড়িতে অতর্কিত হামলা চালায়। মূলত এই হামলার মধ্য দিয়েই ঘটনার সূত্রপাত হয়। তাদের এই বেআইনি হামলায় আমাদের এনাম নামের এক নিরীহ কর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন। আমরাও এর সুষ্ঠু তদন্ত চাই।’
কর্ণফুলী এলাকায় যেন আর কোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক দাঙ্গা বা সংঘাতের সৃষ্টি না হয়, সে জন্য পুলিশ প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। কর্ণফুলী জোনের সহকারী কমিশনার (এসপি) মো. জামাল উদ্দীন চৌধুরী ইটিসি বাংলাকে সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে আশ্বস্ত করে জানান, ‘সংঘর্ষের খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের বিপুল সংখ্যক পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। আমরা বর্তমানে পুরো এলাকায় টহল জোরদার করেছি। এখন পর্যন্ত কোনো পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা দায়ের করা হয়নি, তবে ঘটনার সঙ্গে জড়িত দুষ্কৃতকারীদের চিহ্নিত করার কাজ চলছে। আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে এবং তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
রাজনৈতিক মতাদর্শগত পার্থক্য একটি গণতান্ত্রিক সমাজের সৌন্দর্য। কিন্তু নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এবং পবিত্র রমজান মাস ও একুশের প্রথম প্রহরের মতো তাৎপর্যপূর্ণ সময়ে এ ধরনের সশস্ত্র সংঘাত কোনোভাবেই কাম্য নয়। এলাকার সাধারণ মানুষ বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের মধ্যে দিন পার করছেন। রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বকে এখনই স্থানীয় পর্যায়ে সহনশীলতা ও সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য কঠোর নির্দেশনা প্রদান করতে হবে। নতুবা এই ছোট স্ফুলিঙ্গ ভবিষ্যতে আরও বড় কোনো রাজনৈতিক দাবানলের সৃষ্টি করতে পারে।
