‘জুলাই সনদ দেখলে গ্রামের সেই শয়তান লোকের গল্পটা মনে হয়’: এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান

জুলাই বিপ্লবের দেড় বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও ‘জুলাই সনদ’ বা বিপ্লবীদের স্বীকৃতিপত্র নিয়ে বিতর্ক যেন থামছেই না। এবার এই সনদ এবং এর ব্যবহার নিয়ে এক বিস্ফোরক ও রূপকধর্মী মন্তব্য করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান। সম্প্রতি একটি বেসরকারি গণমাধ্যমকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি জুলাই সনদকে গ্রামের এক ‘শয়তান’ লোকের গল্পের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার এই মন্তব্য মুহূর্তের মধ্যে রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তোলপাড় সৃষ্টি করেছে।

সাক্ষাৎকারে বদিউর রহমান সরাসরি জুলাই সনদের সমালোচনা করতে গিয়ে একটি লোকজ গল্পের অবতারণা করেন। তিনি বলেন, “জুলাই সনদ দেখলে আমার গ্রামের সেই শয়তান লোকটির কথা মনে পড়ে যায়।”

গল্পটির বিস্তারিত বর্ণনা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, “গ্রামে এক অত্যন্ত দুষ্ট বা শয়তান প্রকৃতির লোক ছিল। তার স্বভাবই ছিল মানুষকে অকারণে বিরক্ত করা। বিশেষ করে মানুষের স্পর্শকাতর স্থানে বা পশ্চাৎদেশে আঙুল দিয়ে খোঁচা দেওয়া বা প্রবেশ করানো ছিল তার বিকৃত বিনোদন। গ্রামের মানুষ তার ওপর প্রচণ্ড বিরক্ত ছিল, কিন্তু তার ভয়ে বা ঝামেলা এড়াতে কেউ কিছু বলতে পারত না। এভাবে জীবনভর মানুষকে অতিষ্ঠ করে তোলার পর যখন তার মৃত্যু ঘনিয়ে এল, তখন সে এক অদ্ভুত ফন্দি আঁটল।”

এনবিআরের সাবেক এই চেয়ারম্যান গল্পের বাকি অংশ বর্ণনা করে বলেন, “মৃত্যুশয্যায় শয়তান লোকটি তার ছেলেদের ডেকে বলল—‘বাবারা, আমি তো সারা জীবন গ্রামের মানুষকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। এখন আমি মারা গেলে আমাকে কবর দিস না। বরং তিন রাস্তার মোড়ে একটা লম্বা বাঁশ পুঁতে আমার লাশটা সেই বাঁশের মাথায় গেঁথে রাখবি।’ বাবার শেষ ইচ্ছা বা ওসিয়ত হিসেবে ছেলেরা তাই করল। কিন্তু এর পরিণাম হলো ভয়াবহ। তিন রাস্তার মোড়ে লাশ ঝুলিয়ে রাখার অপরাধে পুলিশ এসে ছেলেদের ধরে নিয়ে গেল এবং তাদের ওপর আইনি খড়গ নেমে এল।”

গল্পের ইতি টেনে বদিউর রহমান বলেন, “শয়তান লোকটির উদ্দেশ্য ছিল, সে বেঁচে থাকতে যেমন মানুষকে জ্বালিয়েছে, মরে গিয়েও যেন তার লাশ দিয়ে মানুষকে এবং নিজের পরিবারকে বিপদে ফেলতে পারে। অর্থাৎ যে শয়তানি করে, সে মৃত্যুর পরও লাশ নিয়ে শয়তানি করে। জুলাই সনদ আমার কাছে ঠিক তেমনই মনে হয়।”

২০২৪ সালের জুলাই মাসে সংঘটিত ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর নতুন সরকার অংশগ্রহণকারীদের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘জুলাই সনদ’ প্রদানের উদ্যোগ নেয়। ২০২৬ সালে এসেও এই সনদের অপব্যবহার, ভুয়া সনদধারীদের দৌরাত্ম্য এবং সনদকে পুঁজি করে সুবিধা আদায়ের অভিযোগ বিভিন্ন মহলে আলোচিত হচ্ছে।

বদিউর রহমানের মন্তব্যের বিশ্লেষণে দেখা যায়, তিনি মূলত সনদকেন্দ্রিক বর্তমান পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করেছেন। তার মতে, এই সনদটি এখন আর কেবল সম্মানের প্রতীক নয়, বরং এটি সমাজে বিভাজন তৈরি এবং মানুষকে হয়রানি করার একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। গল্পের ‘শয়তান লোকটির’ মতোই এই সনদ যেন মরে গিয়েও (বা বিপ্লব পরবর্তী সময়ে) মানুষকে শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। সনদ দেখিয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অনৈতিক সুবিধা দাবি, সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানো কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে, তা-ই সম্ভবত তার এই তীব্র কটাক্ষের মূল কারণ।

সাবেক আমলা হিসেবে বদিউর রহমান বরাবরই স্পষ্টবক্তা হিসেবে পরিচিত। এনবিআর চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়েও তিনি বিভিন্ন সাহসী পদক্ষেপ ও মন্তব্যের জন্য আলোচিত ছিলেন। বর্তমান সময়ে যখন জুলাই বিপ্লবের চেতনা ও তার বাস্তবায়ন নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে, তখন তার মতো একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তির এমন মন্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই সনদ এখন একটি প্রশাসনিক জটিলতায় রূপ নিয়েছে। একদিকে প্রকৃত বিপ্লবীরা অনেক ক্ষেত্রে অবহেলিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সুবিধাবাদীরা সনদ ব্যবহার করে ফায়দা লুটছেন। বদিউর রহমান হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন যে, এই সনদ ব্যবস্থাটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে বা ব্যবহার করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য বোঝা বা ‘বাঁশের মাথায় গেঁথে রাখা লাশের’ মতো সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। যে আদেশ পালন করতে গিয়ে গল্পের ছেলেরা পুলিশের হাতে আটক হয়েছিল, তেমনি এই সনদ ব্যবস্থার কারণে ভবিষ্যতে প্রশাসন ও সাধারণ মানুষকেও আইনি বা সামাজিক ঝামেলায় পড়তে হতে পারে।

বদিউর রহমানের এই সাক্ষাৎকার প্রচারের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। একপক্ষ তার এই সাহসী ও রূপকধর্মী মন্তব্যের প্রশংসা করছেন। তারা বলছেন, বদিউর রহমান কঠিন সত্যটি গল্পের ছলে সহজ করে বলে দিয়েছেন। সনদের নামে যা চলছে, তা আসলেই ‘শয়তানি’ ছাড়া কিছু নয়।

অন্যদিকে, জুলাই বিপ্লবের সমর্থক ও সনদপ্রাপ্তদের একটি অংশ এই মন্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করছেন। তারা মনে করেন, বিপ্লবীদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতিকে ‘শয়তানি’র সঙ্গে তুলনা করা শহীদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি। তাদের মতে, কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার জন্য পুরো সনদ ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে, নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সনদের অপব্যবহার রোধ করা না গেলে বদিউর রহমানের এই শঙ্কা বা রূপক গল্পটিই বাস্তবে রূপ নিতে পারে।

জুলাই বিপ্লব পরবর্তী বাংলাদেশে সংস্কার ও পুনর্গঠনের কাজ চলছে। এর মধ্যে জুলাই সনদকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক দানা বেঁধেছে, তা বদিউর রহমানের মন্তব্যে নতুন মাত্রা পেল। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এখন ভাবতে হবে, কীভাবে এই সনদের মর্যাদা রক্ষা করা যায় এবং এর অপব্যবহার রোধ করা যায়। নতুবা, গল্পের সেই শয়তান লোকটির মতোই এই সনদ ব্যবস্থাটি ভবিষ্যতে সমাজের জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যানের এই হুঁশিয়ারি বা সতর্কবার্তা নীতিনির্ধারকরা কতটুকু আমলে নেবেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন