শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি নয়, দেশ গড়াই লক্ষ্য, প্রথম কর্মদিবসে সংস্কারের ডাক দিলেন প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ

বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন ও আধুনিকায়নের বার্তা নিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করলেন নতুন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। শপথ গ্রহণের পর বৃহস্পতিবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) ছিল তার প্রথম কর্মদিবস। সচিবালয়ে নিজ দপ্তরে এসেই তিনি শিক্ষা খাতকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি করবে না সরকার, শিক্ষা নিয়ে দেশ গড়ব।”

প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্য এবং প্রথম দিনের কর্মপরিকল্পনা শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহল, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে।

বৃহস্পতিবার সকালে সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে উপস্থিত হয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে পরিচিত হন ববি হাজ্জাজ। এরপর সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি তার ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমাদের লক্ষ্য কেবল সার্টিফিকেটসর্বস্ব শিক্ষা নয়, বরং এমন এক প্রজন্ম তৈরি করা যারা বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। অতীতে শিক্ষাাঙ্গনে রাজনৈতিক অস্থিরতা আমরা দেখেছি, কিন্তু এই সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে দেবে না। আমাদের একমাত্র রাজনীতি হবে শিক্ষার মান উন্নয়ন এবং দেশ গঠন।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এর আওতাধীন সকল প্রতিষ্ঠানকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে। দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ইঙ্গিতও দেন তিনি।

বিশ্বায়নের এই যুগে কেবল বাংলা ও ইংরেজি জানাই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন নতুন শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন আনা হবে।

ববি হাজ্জাজ বলেন, “আমাদের দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রবাসে কাজ করেন, কিন্তু ভাষাগত দক্ষতার অভাবে তারা অনেক সময় উপযুক্ত বেতন ও মর্যাদা পান না। তাই বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি শ্রমবাজারে প্রয়োজন আছে—এমন ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা করা হবে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিমন্ত্রীর এই উদ্যোগের ফলে মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীরা জাপানি, কোরিয়ান, চীনা, আরবি বা ফরাসি ভাষার মতো বিদেশি ভাষা শেখার সুযোগ পেতে পারে। এটি ভবিষ্যতের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের দক্ষ করে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে।

প্রথাগত শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দেন ববি হাজ্জাজ। তিনি ঘোষণা করেন, এখন থেকে মাধ্যমিক পর্যায়েই কারিগরি শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এর উদ্দেশ্য হলো, একজন শিক্ষার্থী যেন এসএসসি বা এইচএসসি পাসের পরই কোনো না কোনো কারিগরি দক্ষতা অর্জন করতে পারে।

তিনি বলেন, “বেকারত্ব দূর করতে হলে আমাদের শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে কাজ শেখাতে হবে। পুঁথিগত বিদ্যা দিয়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়। তাই সাধারণ শিক্ষার কারিকুলামের মধ্যেই আমরা কারিগরি বিষয়গুলোকে এমনভাবে যুক্ত করব, যাতে শিক্ষার্থীরা কর্মমুখী শিক্ষা লাভ করতে পারে।”

শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের কথা চিন্তা করে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের কথা জানান প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, “মাধ্যমিক স্তর থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করা হবে। কেবল বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে থাকলে চলবে না, সুস্থ দেহ ও সুন্দর মনের জন্য মাঠের খেলাধুলার বিকল্প নেই।”

বর্তমান সময়ে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে মোবাইল আসক্তি এবং মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার রোধে খেলাধুলা একটি শক্তিশালী মাধ্যম হতে পারে। প্রতিমন্ত্রীর এই ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন ক্রীড়াবিদ ও শিক্ষাবিদরা। তারা মনে করেন, প্রতিটি স্কুলে খেলার মাঠ নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত ক্রীড়া প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হলে শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটবে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দীর্ঘদিনের অভিযোগ ও অনিয়ম দূর করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন ববি হাজ্জাজ। তিনি বলেন, “শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে মন্ত্রণালয়—প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হবে। এমপিওভুক্তি, শিক্ষক নিয়োগ, বদলি কিংবা অবকাঠামো উন্নয়ন—কোথাও কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না। আমরা ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করব যাতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়।”

ববি হাজ্জাজের এই বক্তব্য এবং পরিকল্পনাকে অত্যন্ত সময়োপযোগী বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের একজন অধ্যাপক বলেন, “২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো জরুরি হয়ে পড়েছিল। প্রতিমন্ত্রী যদি তার এই পরিকল্পনাগুলো—বিশেষ করে ভাষা শিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষার বিষয়টি—বাস্তবায়ন করতে পারেন, তবে তা দেশের অর্থনীতির জন্য গেম চেঞ্জার হবে।”

অভিভাবকরাও স্বস্তি প্রকাশ করেছেন। রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, “আমরা চাই আমাদের সন্তানরা রাজনীতিমুক্ত পরিবেশে পড়াশোনা করুক। স্কুলে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্তটি খুবই প্রশংসনীয়। আমরা আশা করি নতুন প্রতিমন্ত্রী তার কথা রাখবেন।”

তবে এই পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়ন করা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে সারাদেশে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ নিশ্চিত করা, কারিগরি শিক্ষার জন্য ল্যাব ও সরঞ্জাম প্রদান এবং বিদেশি ভাষা শেখানোর জন্য দক্ষ প্রশিক্ষক নিয়োগ দেওয়া সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। এছাড়া শিক্ষা প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা দুর্নীতিবাজ চক্রকে প্রতিহত করাও সহজ হবে না।

তবুও ববি হাজ্জাজের তারুণ্যদীপ্ত নেতৃত্ব এবং আধুনিক চিন্তাধারা শিক্ষাখাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে বলে বিশ্বাস সাধারণ মানুষের। ২০২৬ সালকে বাংলাদেশের শিক্ষাখাতের ঘুরে দাঁড়ানোর বছর হিসেবে দেখতে চান সবাই।

প্রথম কর্মদিবসেই ববি হাজ্জাজ বুঝিয়ে দিলেন, তিনি গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে কাজ করতে চান। শিক্ষা নিয়ে রাজনীতি না করে দেশ গড়ার যে শপথ তিনি নিয়েছেন, তা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ দ্রুতই একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হবে। আগামীর দিনগুলোতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমের দিকেই তাকিয়ে থাকবে পুরো জাতি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন