রপ্তানি বাণিজ্যে নতুন দিগন্ত, পোশাক খাতের বাইরে আশার আলো জাগাচ্ছে

দেশের রফতানি বাণিজ্যের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে তৈরি পোশাক খাতের (RMG) বিশাল কর্মযজ্ঞ। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের প্রধান চাকা হিসেবে কাজ করছে এই খাত। কিন্তু অর্থনীতির একটি সাধারণ সূত্র হলো, ‘এক ঝুড়িতে সব ডিম রাখা’ কখনোই নিরাপদ নয়। সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব অর্থনীতির মন্দাভাব এবং অভ্যন্তরীণ নানা চ্যালেঞ্জের কারণে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে (জুলাই-জানুয়ারি) সামগ্রিক রফতানি আয়ে কিছুটা ভাটা পড়েছে। তবে এই নেতিবাচক খবরের আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। তথাকথিত ‘হেভিওয়েট’ বা প্রধান খাতগুলোর বাইরে আলোচনার আড়ালে থাকা বেশ কিছু অপ্রচলিত পণ্য রফতানিতে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিচ্ছে।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (EPB) সদ্য প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রকৌশল পণ্য, বাইসাইকেল, ওষুধ, জাহাজ নির্মাণ, চামড়াজাত পণ্য এবং কৃষিভিত্তিক প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রফতানিতে এক নীরব বিপ্লব ঘটছে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, এই প্রবৃদ্ধি কেবল সংখ্যার বিচারেই নয়, বরং দেশের রফতানি পণ্যের ঝুড়িকে বৈচিত্র্যময় করার ক্ষেত্রে এক বিশাল মাইলফলক।

ইপিবির তথ্যমতে, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে জানুয়ারি—এই সাত মাসে বাংলাদেশের মোট পণ্য রফতানি আয় দাঁড়িয়েছে ২৮ দশমিক ৪১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এই আয় প্রায় ২ শতাংশ কম। আপাতদৃষ্টিতে এটি হতাশার মনে হলেও, খাতওয়ারি বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। তৈরি পোশাকের ওপর অতিনির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠে অন্যান্য ছোট ও মাঝারি শিল্পখাতগুলো তাদের সক্ষমতার জানান দিচ্ছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে সবচেয়ে বড় এবং ইতিবাচক চমক দেখিয়েছে প্রকৌশল খাত (Engineering Sector)। দীর্ঘদিনের অবহেলা কাটিয়ে এই খাতটি এখন রফতানি আয়ের অন্যতম স্তম্ভ হয়ে ওঠার পথে। ইপিবির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত সাত মাসে প্রকৌশল পণ্যের রফতানি বেড়েছে প্রায় ২৬ শতাংশ। এই খাত থেকে আয় হয়েছে ৩৬ কোটি ৯ লাখ মার্কিন ডলার। বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, কপার ওয়্যার, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ এবং হালকা প্রকৌশল পণ্যগুলো বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করছে।

একই সঙ্গে রফতানি বাণিজ্যে নতুন গতি এনেছে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ বাইসাইকেল। ইউরোপসহ পশ্চিমা বিশ্বে পরিবেশবান্ধব যাতায়াত ব্যবস্থার জনপ্রিয়তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বাংলাদেশের বাইসাইকেলের চাহিদা। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বাইসাইকেল রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩১ শতাংশ, যা একটি রেকর্ড। এই খাত থেকে আয় হয়েছে ৮ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি। এটি প্রমাণ করে যে, যথাযথ মান নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে ভারী ও মাঝারি শিল্পপণ্যেও বাংলাদেশ বিশ্বমানের প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম।

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প (Pharmaceuticals) এখন আর কেবল দেশের চাহিদা মেটানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের ওষুধের চাহিদা বাড়ছে জ্যামিতিক হারে। অর্থবছরের প্রথম সাত মাসে ওষুধ রফতানি থেকে আয় হয়েছে প্রায় ১৪ কোটি ডলার, যেখানে প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ৫ শতাংশের বেশি। গুণগত মান এবং সাশ্রয়ী দামের কারণে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের জেনেরিক ওষুধের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।

অন্যদিকে, জাহাজ রফতানি শিল্পও নতুন করে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি আকারের সমুদ্রগামী জাহাজ এবং ফিশিং ট্রলার নির্মাণে বাংলাদেশের দক্ষতা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের নজর কেড়েছে। এই খাত থেকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়েছে।

একসময়ের ‘সোনালী আঁশ’ পাট এবং পাটজাত পণ্যের রফতানিতেও আশার সঞ্চার হয়েছে। জুট ইয়ার্ন ও জুট ব্যাগের চাহিদা বাড়ায় এই খাতে রফতানি আয় বেড়েছে। পাশাপাশি চামড়াজাত পণ্যের (Leather Goods) রফতানিতেও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে ভ্যালু অ্যাডেড বা মূল্য সংযোজিত চামড়াজাত পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হচ্ছে।

কৃষিভিত্তিক পণ্যের মধ্যে গুড়া মশলা, ফলমূল এবং শাকসবজি রফতানি বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। হিমায়িত মৎস্য খাতে চিংড়ি ও জীবন্ত মাছের পাশাপাশি কাঁকড়া (Crab) রফতানি নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রবাসীদের পাশাপাশি বিদেশি নাগরিকদের খাদ্যাভ্যাসে বাংলাদেশি কৃষি পণ্যের অন্তর্ভুক্তি এই প্রবৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্যের অন্যতম দুর্বলতা ছিল নির্দিষ্ট কয়েকটি বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (EU) দেশগুলোর ওপর অতিনির্ভরশীলতা ঝুঁকি তৈরি করত। তবে সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে, এই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে।

চলতি অর্থবছরের ৭ মাসে চীনে রফতানি বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। এশীয় পরাশক্তি এই দেশটির বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকার এবং শুল্কমুক্ত সুবিধা কাজে লাগিয়ে আয় হয়েছে ৪৯ কোটি ৩ লাখ ডলার। অন্যদিকে, পূর্ব ইউরোপের দেশ পোল্যান্ডেও বাংলাদেশি পণ্যের কদর বাড়ছে। সেখানে রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ শতাংশের বেশি। অপ্রচলিত বাজারের এই উত্থান দেশের অর্থনীতির জন্য একটি স্বস্তিদায়ক খবর।

অর্থনীতিবিদ এবং বাণিজ্য বিশ্লেষকরা এই প্রবণতাকে অত্যন্ত ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, রফতানি আয় কমে যাওয়ার মূল কারণ একক পণ্যের (পোশাক খাত) ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরতা। কোনো কারণে বৈশ্বিক বাজারে পোশাকের চাহিদা কমলে পুরো দেশের অর্থনীতিতে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, “বাংলাদেশের রফতানি আয় দীর্ঘদিন ধরে গুটিকয়েক বাজার এবং পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ট্রেডিশনাল পণ্য থেকে বেরিয়ে এসে এখন নতুন পণ্যের দিকে নজর দেওয়ার সময় এসেছে। আঞ্চলিকভাবে যেসব পণ্য উৎপাদিত হচ্ছে, সেগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে তুলে ধরতে হবে। প্রকৌশল, কৃষি এবং চামড়াশিল্পে যে প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে, তাকে টেকসই করতে হলে দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা প্রয়োজন।”

তৈরি পোশাক খাতে সাময়িক চাপ বা অস্থিরতা থাকলেও অপ্রচলিত ও নতুন পণ্যের রফতানিতে যে গতি সঞ্চারিত হয়েছে, তা দেশের বৈদেশিক আয়ের কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করবে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তবে এই প্রবৃদ্ধিকে ধরে রাখতে হলে প্রয়োজন সরকারি প্রণোদনা, বন্দর জটিলতা নিরসন এবং নতুন নতুন বাজার অনুসন্ধান। প্রকৌশল পণ্য বা বাইসাইকেলের মতো খাতগুলো যদি যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা পায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগযুক্ত পণ্য বিশ্ববাজারের প্রতিটি কোণায় পৌঁছে যাবে—এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন