ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই যেন সময় থমকে যাওয়া, পরিসংখ্যানের লড়াইয়ে এগিয়ে কে?

ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘ব্লকবাস্টার’ বললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে নীল এবং সবুজ জার্সির দ্বৈরথ। ভারত বনাম পাকিস্তান—এই দুটি নাম যখন একই বাক্যে উচ্চারিত হয়, তখন সেটি আর নিছক ২২ গজের খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। মাঠের লড়াই ছাপিয়ে যা হয়ে ওঠে এক তীব্র স্নায়ুযুদ্ধ। গ্যালারির উত্তাপ মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে ওয়াঘা সীমান্তের দুই পাড়ের কোটি কোটি মানুষের ড্রয়িং রুমে। ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই যেন সময় থমকে যাওয়া, হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়া এবং শ্রেষ্ঠত্বের এক অলিখিত সনদ অর্জনের লড়াই। কিন্তু আবেগের এই ফানুস ওড়ানোর পাশাপাশি যদি আমরা সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানের দিকে তাকাই, তবে সেখানে রোমাঞ্চের চেয়ে একপাক্ষিক আধিপত্যের গল্পই বেশি চোখে পড়ে।

একটা সময় ছিল যখন শারজাহর মাঠে শেষ বলের ছক্কা কিংবা বেঙ্গালুরুতে ভেঙ্কটেশ প্রসাদ বনাম আমির সোহেলের লড়াই ক্রিকেট রোমান্টিকদের ঘুম হারাম করে দিত। দুই দলের শক্তিমত্তা ছিল সমানে সমান। কিন্তু গত এক দশকে ক্রিকেটের এই ধ্রুপদী লড়াইয়ের চিত্রনাট্য অনেকটাই বদলে গেছে। বিশেষ করে আইসিসি (ICC) ইভেন্টগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের বিপক্ষে ভারত যেন এক অপ্রতিরোধ্য শক্তি। ম্যাচের আগে বাবর আজম বা শাহিন আফ্রিদিদের নিয়ে যতই হম্বিতম্বি হোক না কেন, মাঠের পারফরম্যান্সে বারবার ফিকে হয়ে পড়েছে পাকিস্তান। টিম ইন্ডিয়া রেকর্ড বই নতুন করে লিখছে নিজেদের মতো করে।

আইসিসি ওয়ানডে বিশ্বকাপে ভারতের আধিপত্য এখন প্রশ্নাতীত। পরিসংখ্যানের পাতায় তাকালে দেখা যায়, ওয়ানডে বিশ্বকাপে পাকিস্তানের বিপক্ষে ভারতের জয়ের রেকর্ড ৮-০। অর্থাৎ, বিশ্বমঞ্চে ৫০ ওভারের ক্রিকেটে কখনোই ভারতকে হারাতে পারেনি পাকিস্তান। ১৯৯২ সাল থেকে শুরু করে সবশেষ ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপ—প্রতিবারই জয়ী দলের নাম ভারত। আহমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ ম্যাচে রোহিত শর্মার দল যেভাবে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের উড়িয়ে দিয়েছিল, তা ছিল ভারতের আধুনিক ক্রিকেট শক্তির এক নিদারুণ প্রদর্শনী। সেদিন পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছিল ভারতীয় বোলারদের সামনে।

তবে মুদ্রার উল্টো পিঠও দেখেছে ক্রিকেট বিশ্ব। ২০২১ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ছিল পাকিস্তানের জন্য এক স্বস্তির নিঃশ্বাস। দুবাইয়ের মাটিতে বাবর আজম ও মোহাম্মদ রিজওয়ানের দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ে ১০ উইকেটের ঐতিহাসিক জয় পেয়েছিল পাকিস্তান। সেটিই ছিল বিশ্বমঞ্চে (ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ মিলিয়ে) ভারতের বিপক্ষে পাকিস্তানের প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র জয়। সেই জয়টি পাকিস্তানি সমর্থকদের মনে আশা জাগিয়েছিল যে, হয়তো দিন বদলাচ্ছে। কিন্তু সেই আশা খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

২০২২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের স্মৃতি কি এত সহজে ভোলা সম্ভব? মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে (MCG) প্রায় এক লক্ষ দর্শকের সামনে বিরাট কোহলি যা করেছিলেন, তা ক্রিকেট ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। হ্যারিস রউফের বলে কোহলির সেই ব্যাক-ফুট সিক্স এবং অশ্বিনের শেষ মুহূর্তের বুদ্ধিমত্তা পাকিস্তানের হাত থেকে নিশ্চিত জয় ছিনিয়ে নিয়েছিল। সেই ম্যাচটি প্রমাণ করে দিয়েছিল, স্কিল বা প্রতিভার চেয়েও ভারত-পাকিস্তান ম্যাচে বড় হয়ে দাঁড়ায় স্নায়ু ধরে রাখার ক্ষমতা। যেখানে ভারত বারবার নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করেছে।

এই আধিপত্যের সর্বশেষ নজির দেখা গেছে ২০২৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে। নিউ ইয়র্কের নাসাউ কাউন্টি স্টেডিয়ামের কঠিন পিচে অত্যন্ত কম রানের পুঁজি নিয়েও জয় ছিনিয়ে নেয় টিম ইন্ডিয়া। জসপ্রীত বুমরাহ, হার্দিক পান্ডিয়াদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপের ব্যর্থতা আবারও বড় মঞ্চে প্রকট হয়ে ওঠে। জেতা ম্যাচ হাতছাড়া করার যে ‘বদনাম’ পাকিস্তানের রয়েছে, তা যেন আবারও প্রমাণিত হলো।

ঐতিহাসিকভাবে ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই ভারতের বিশ্বসেরা ব্যাটিং লাইনআপের সঙ্গে পাকিস্তানের ভয়ঙ্কর বোলিং ইউনিটের লড়াই। ওয়াসিম-ওয়াকার থেকে শুরু করে আজকের শাহিন-নাসিম—পাকিস্তানের পেস ব্যাটারি সবসময়ই সমীহের যোগ্য। অন্যদিকে ভারত উপহার দিয়েছে শচীন, সৌরভ, দ্রাবিড় থেকে শুরু করে কোহলি, রোহিত, গিলদের মতো ব্যাটার।

তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই সমীকরণে কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। ভারতের বোলিং ইউনিট এখন বিশ্বের অন্যতম সেরা, যা পাকিস্তানের ব্যাটিং দুর্বলতাকে বারবার উস্কে দিচ্ছে। পাকিস্তানের মিডল অর্ডারের ধারাবাহিকতার অভাব এবং ফিল্ডিংয়ের দৃষ্টিকটু ভুলগুলো ভারতের জয়ের পথকে অনেক সহজ করে দিয়েছে। বড় ম্যাচে চাপের মুখে ভেঙে পড়ার পুরনো রোগ থেকে এখনও মুক্ত হতে পারেনি পাকিস্তান।

এবারের লড়াইয়ের প্রেক্ষাপট অবশ্য কিছুটা ভিন্ন ছিল। মাঠের ক্রিকেটের চেয়ে মাঠের বাইরের রাজনীতি ও কূটনীতিই বেশি আলোচনায় ছিল। ২০২৫ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিকে কেন্দ্র করে ভেন্যু জটিলতা আর ‘হাইব্রিড মডেল’ নিয়ে জলঘোলা কম হয়নি। ভারত পাকিস্তানে গিয়ে খেলতে অস্বীকৃতি জানানোর পর থেকেই শুরু হয় নাটকীয়তা। পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (PCB) পাল্টা হুমকি দেয়, এমনকি বাংলাদেশ ইস্যুতে রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে ম্যাচ বয়কটের ডাক দিয়ে উত্তেজনা চরমে তোলে পাকিস্তান।

ক্রিকেট ভক্তদের মনে সংশয় ছিল, আদৌ কি এই হাইভোল্টেজ ম্যাচ মাঠে গড়াবে? তবে সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে, অনেক সংশয় আর নাটকীয়তার পর শেষ পর্যন্ত ক্রিকেটই জয়ী হয়েছে। দুই দেশের ক্রিকেট বোর্ড ও আইসিসির মধ্যস্থতায় ম্যাচের ফয়সালা হয়েছে। যদিও দুই দেশের খেলোয়াড়দের মধ্যে মাঠে ও মাঠের বাইরে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ও বন্ধুত্বের আবহাওয়া দেখা যায়, কিন্তু সীমান্তের দুই পাড়ে রাজনৈতিক বৈরী ভাব এবং সমর্থকদের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে ক্রিকেটারদের ওপর চাপটা থাকে পাহাড়সম।

যদি সামগ্রিক ওয়ানডে ক্রিকেটের মুখোমুখি পরিসংখ্যান দেখা যায়, তবে ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তান এখনও ভারতের চেয়ে এগিয়ে। দুই দল এখন পর্যন্ত ১৩০টিরও বেশি ওয়ানডে ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছে, যার মধ্যে জয়ের পাল্লা পাকিস্তানের দিকেই ভারী (৭০টির বেশি জয়)। কিন্তু আধুনিক ক্রিকেট, বিশেষ করে গত ১৫ বছরের পরিসংখ্যান এবং আইসিসি ইভেন্টের হিসাব কষলে ভারত যোজন যোজন এগিয়ে। দ্বিপাক্ষিক সিরিজ বন্ধ থাকায় এখন এই দুই দলের দেখা হয় কেবল এশিয়া কাপ বা আইসিসি ইভেন্টে, আর সেখানেই ‘টিম ইন্ডিয়া’ হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য।

শেষ কথা হলো, পরিসংখ্যান যা-ই বলুক না কেন, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ মানেই অনিশ্চয়তা। নির্দিষ্ট দিনে যারা স্নায়ুর চাপ সামলে পারফর্ম করতে পারবে, দিনশেষে বিজয়মাল্য তাদের গলাতেই উঠবে। তবে বর্তমান ফর্ম, দলের ভারসাম্য এবং মানসিক দৃঢ়তার বিচারে ইটিসি বাংলার বিশ্লেষণে এই মুহূর্তে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে বেশ কয়েক কদম এগিয়ে রোহিত শর্মার ভারত। এখন দেখার বিষয়, মাঠের লড়াইয়ে পাকিস্তান সেই ব্যবধান ঘুচিয়ে নতুন কোনো ইতিহাসের জন্ম দিতে পারে কি না।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন