তারেক রহমানকে নরেন্দ্র মোদির উষ্ণ অভিনন্দন, ‘গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল’ বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ভারতের

বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঐতিহাসিক বিজয়ের মাধ্যমে সরকার গঠনের পথে এগিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি ও তাদের জোটের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের খবর নিশ্চিত হওয়ার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্স’-এ (সাবেক টুইটার) এক বার্তার মাধ্যমে এই অভিনন্দন জানান তিনি। প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তাটি ঢাকার নতুন সরকারের সঙ্গে দিল্লির ভবিষ্যৎ সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ইতিবাচক ও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।

মিডিয়া রিপোর্ট ও এনডিটিভি’র খবর অনুযায়ী, ভারতের প্রধানমন্ত্রী তার বার্তায় বাংলাদেশের জনগণের রায়ের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন এবং দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

শুক্রবার দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া ওই পোস্টে নরেন্দ্র মোদি লিখেন, “বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচনে বিএনপিকে এক বড় বিজয়ে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য আমি তারেক রহমানকে আমার উষ্ণ অভিনন্দন জানাই।”

তিনি আরও উল্লেখ করেন, “এই জয় আপনার নেতৃত্বের ওপর বাংলাদেশের জনগণের আস্থার প্রতিফলন।”

মোদির এই মন্তব্যের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট যে, ভারত বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং জনগণের রায়কে সর্বান্তকরণে গ্রহণ করেছে। অতীতে বিভিন্ন সময়ে ভারতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কের টানাপড়েন নিয়ে নানা বিশ্লেষণ থাকলেও, মোদির এই বার্তা প্রমাণ করে যে, রাষ্ট্র টু রাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারত এখন অত্যন্ত প্রাগম্যাটিক বা বাস্তববাদী নীতি অনুসরণ করছে।

পোস্টে ভারতের প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “ভারত একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখবে।” এই বাক্যটি কূটনৈতিকভাবে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক’ ও ‘প্রগতিশীল’ শব্দ দুটির মাধ্যমে ভারত বুঝিয়ে দিয়েছে যে, তারা বাংলাদেশে এমন একটি সরকার ব্যবস্থা প্রত্যাশা করে যেখানে সকল ধর্ম ও মতের মানুষের সহাবস্থান নিশ্চিত থাকবে।

সবশেষে মোদি বলেন, “আমাদের বহুমুখী সম্পর্ক জোরদার করতে এবং আমাদের সাধারণ উন্নয়ন লক্ষ্যগুলোকে এগিয়ে নিতে আপনার সাথে কাজ করার জন্য আমি উন্মুখ হয়ে আছি।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে বাণিজ্য, কানেক্টিভিটি এবং নিরাপত্তার মতো পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোতে নতুন সরকারের সঙ্গে ভারত যে নিবিড়ভাবে কাজ করতে চায়, তার ইঙ্গিত মিলল।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ শেষে রাতে এবং শুক্রবার সকালে ফলাফল আসতে শুরু করে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২৮৯টি আসনের বেসরকারি ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, বিএনপি ও তাদের নেতৃত্বাধীন জোট ২১০টি আসনে জয়লাভ করেছে। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ায় সরকার গঠনে আর কোনো বাধা নেই দলটির। আর এই সরকারের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন দলের শীর্ষ নেতা তারেক রহমান।

এই বিশাল জয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশি সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার পর জনগণের ভোটে এমন রাজসিক প্রত্যাবর্তন দলটির সাংগঠনিক শক্তির প্রমাণ দেয়।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, এবার ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। শেরপুর-৩ (ঝিনাইগাতী-শ্রীবরদী) আসনে একজন বৈধ প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে বা আইনি জটিলতায় নির্বাচন কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে। বাকি ২৯৯টি আসনে মোট ২ হাজার ২৯ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৭৫৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন ২৭৪ জন।

নারীদের অংশগ্রহণও ছিল চোখে পড়ার মতো। মোট ৮৩ জন নারী প্রার্থী নির্বাচনে লড়েছেন, যার মধ্যে দলীয় ৬৩ জন এবং স্বতন্ত্র ২০ জন। এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের রাজনীতিতে নারীদের আগ্রহ বৃদ্ধির বিষয়টি তুলে ধরে।

ভোটার সংখ্যার দিক থেকেও এবারের নির্বাচন ছিল ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ। মোট ভোটার ছিল ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৭৯৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ৩৬১ জন এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ২০০ জন। এছাড়া তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়া সম্প্রদায়ের ১ হাজার ২৩২ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন। প্রবাসীদের অংশগ্রহণের জন্য ১২৪টি দেশে পোস্টাল ব্যালট পাঠানোর ব্যবস্থাও ছিল এবার, যা নির্বাচন কমিশনের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ।

নরেন্দ্র মোদির অভিনন্দন বার্তা এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের আগমন—এই দুইয়ের মেলবন্ধনে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করতে যাচ্ছে। বিগত সরকারের আমলে দুই দেশের সম্পর্ককে ‘সোনালী অধ্যায়’ বলা হতো। তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপির শাসনামলেও ভারত তাদের কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থেই বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখবে।

বিশেষ করে মোদি তার বার্তায় ‘সাধারণ উন্নয়ন লক্ষ্য’ এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেছেন। এর অর্থ হলো, বিদ্যুৎ, ট্রানজিট, এবং সীমান্ত বাণিজ্যের মতো চলমান প্রকল্পগুলো অব্যাহত থাকবে। তবে পানি বণ্টন চুক্তি এবং সীমান্ত হত্যার মতো স্পর্শকাতর বিষয়গুলোতে নতুন সরকার দিল্লির সঙ্গে কীভাবে দরকষাকষি করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

শুধু ভারত নয়, যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস থেকেও এর আগে তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানানো হয়েছে। এখন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর এই বার্তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন সরকারের গ্রহণযোগ্যতা আরও বাড়িয়ে দিল। দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবেশী ও পরাশক্তিগুলো তাদের অবস্থান পরিষ্কার করছে।

বিএনপির পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে যে, তারা ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, তবে তা হতে হবে সমতা ও ন্যায়ের ভিত্তিতে। তারেক রহমান নিজেও বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, বাংলাদেশের স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে যেকোনো দেশের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত তার দল।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ২১০ আসনে জয়ী হয়ে যে ম্যান্ডেট পেয়েছে, তা অভাবনীয়। আর এই বিজয়ের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উষ্ণ অভিনন্দন বার্তা দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলার ইঙ্গিত দেয়। এখন সময় বলে দেবে, ‘গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল’ বাংলাদেশের প্রত্যাশায় ভারত ও বাংলাদেশের নতুন সরকার কতদূর একসঙ্গে হাঁটতে পারে। তবে আপাতত, মোদির এই বার্তা নতুন সরকারের জন্য নিঃসন্দেহে এক বড় কূটনৈতিক বিজয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন