চট্টগ্রাম বন্দরে ফের অচলাবস্থার শঙ্কা, কাল থেকে লাগাতার ধর্মঘটের ডাক

দুই দিনের সংক্ষিপ্ত বিরতি শেষে আবারও উত্তাল হতে যাচ্ছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (NCT) বিদেশি প্রতিষ্ঠান ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’-কে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিলসহ চার দফা দাবিতে কাল রবিবার সকাল আটটা থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে লাগাতার ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে ‘চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ’। একই সঙ্গে বন্দরের বহির্নোঙরেও পণ্য খালাসসহ সকল প্রকার কাজ বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

আজ শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এই কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা দেন সংগ্রাম পরিষদের দুই প্রধান সমন্বয়ক হুমায়ুন কবীর ও ইব্রাহিম খোকন।

সংবাদ সম্মেলনে নেতৃবৃন্দ জানান, গত বৃহস্পতিবার নৌপরিবহন উপদেষ্টার সঙ্গে এক ফলপ্রসূ বৈঠকের পর ব্যবসায়িক ক্ষতি এবং পবিত্র রমজান মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার স্বার্থে তারা আন্দোলন দুই দিনের জন্য স্থগিত করেছিলেন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, আন্দোলন স্থগিতের পরপরই বন্দর কর্তৃপক্ষ আন্দোলনরত ১৫ জন কর্মচারীর স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ তদন্তের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) আবেদন জানায় এবং তাদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির প্রক্রিয়া শুরু করে।

সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা দেশের স্বার্থে এবং ব্যবসায়ীদের কথা চিন্তা করে নমনীয় হয়েছিলাম। কিন্তু বন্দর চেয়ারম্যান (রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামান) সমঝোতার পথে না হেঁটে উল্টো দমন-পীড়ন ও প্রতিহিংসার পথ বেছে নিয়েছেন। আন্দোলনকারীদের ব্যক্তিগত সম্পদ নিয়ে দুদকের ভয় দেখিয়ে আন্দোলন দমন করা যাবে না। পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার দায় সম্পূর্ণ বন্দর চেয়ারম্যানের।”

উল্লেখ্য, এনসিটি টার্মিনালটি বিদেশি কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গত শনিবার থেকে প্রতিদিন আট ঘণ্টা করে তিন দিন এবং পরবর্তীতে মঙ্গলবার থেকে লাগাতার কর্মবিরতি পালন করে আসছিল সংগঠনটি। এর ফলে বন্দরে কনটেইনার জট তৈরি হয় এবং পণ্য পরিবহন পুরোপুরি অচল হয়ে পড়ে। ব্যবসায়ী মহলে চরম উদ্বেগ দেখা দিলে নৌপরিবহন উপদেষ্টা হস্তক্ষেপ করেন, যার প্রেক্ষিতে সাময়িকভাবে কর্মসূচি স্থগিত করা হয়েছিল।

আজকের সংবাদ সম্মেলনে আন্দোলনকারীরা সরকারের কাছে অত্যন্ত সুস্পষ্টভাবে চারটি দাবি পেশ করেছেন: ১. লিজ বাতিল: এনসিটি (NCT) ডিপি ওয়ার্ল্ডকে লিজ না দেওয়ার বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ও চূড়ান্ত ঘোষণা আসতে হবে। ২. চেয়ারম্যানের অপসারণ: বর্তমান বন্দর চেয়ারম্যানকে অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করে তার কার্যক্রমের জন্য আইনের আওতায় এনে জিজ্ঞাসাবাদ করতে হবে। ৩. শাস্তি বাতিল: চলমান আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী কর্মচারীদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত গৃহীত সকল প্রকার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। ৪. হয়রানি বন্ধ: ভবিষ্যতে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আইনগত ব্যবস্থা বা হয়রানি করা হবে না—এমন নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে।

চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের আমদান-রপ্তানি বাণিজ্যের সিংহভাগ সম্পন্ন হয়। রমজান মাস সামনে রেখে এই মুহূর্তে বন্দর অচল হওয়া মানে সাধারণ বাজারে এর ভয়াবহ প্রভাব পড়া। নিত্যপণ্যের দাম হু-হু করে বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা। চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পক্ষ থেকে সমঝোতার আহ্বান জানানো হলেও, আন্দোলনকারীরা বলছেন—দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার কারণেই তারা আবারও ধর্মঘটে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এবারের ধর্মঘট চলবে। কাল সকাল থেকে বন্দরের জেটি ও বহির্নোঙরে কোনো জাহাজ থেকে পণ্য নামানো হবে না এবং কোনো ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যান প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসায়ী সমাজ এখন তাকিয়ে আছে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে। এই সংকট নিরসনে দ্রুত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে দেশের সাপ্লাই চেইন বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন