শিশু নিখোঁজের ভুয়া নাটক সাজিয়ে ড্রেন পরিষ্কার করালেন নারী

নাগরিক সেবা পেতে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে ঘুরে যখন সাধারণ মানুষ ক্লান্ত, তখন প্রতিবাদের ভাষা বা কৌশল যে কতটা অভিনব ও চরম পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে, তার এক বিস্ময়কর নজির দেখা গেল ভারতের উত্তর প্রদেশে। দীর্ঘদিনের জমে থাকা নোংরা ড্রেন পরিষ্কার করাতে পৌরসভা ও প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হয়ে এক নারী সাজালেন ‘শিশু নিখোঁজের’ নাটক। তার একটি মিথ্যা ফোন কলে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও পৌর কর্মীরা হন্যে হয়ে ড্রেন পরিষ্কার করলেন, অথচ শেষে জানা গেল—কোনো শিশু আদৌ নিখোঁজ হয়নি!

গত মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) ভারতের উত্তর প্রদেশের মীরাট শহরে ঘটা এই ঘটনাটি এখন টক অব দ্য টাউন। স্থানীয় বাসিন্দা ওই নারীর বুদ্ধিমত্তা বা ‘চাতুর্য’ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে তুমুল বিতর্ক। কেউ তাকে ‘জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধি’ বলছেন, আবার কেউ কেউ প্রশাসনের জনবল ও সময়ের অপচয়ের জন্য তার সমালোচনা করছেন।


ঘটনার সূত্রপাত মঙ্গলবার দুপুরে। মীরাট পুলিশের জরুরি সেবা নম্বরে একটি ফোন আসে। ফোনের ওপাশ থেকে এক নারী আতঙ্কিত কণ্ঠে দাবি করেন, তার এলাকার একটি খোলা ড্রেনে একটি শিশু পড়ে গেছে এবং ড্রেনের ভেতর থেকে শিশুটির কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। খবরটি শোনামাত্রই স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। শিশু মৃত্যুর মতো স্পর্শকাতর বিষয় হওয়ায় কালক্ষেপণ না করে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশের একটি দল।

পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে খবর দেওয়া হয় দমকল বাহিনীকে। ডাকা হয় পৌরসভার পরিচ্ছন্নতা কর্মীদেরও। ড্রেনটি দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় আবর্জনা ও কাদা জমে শক্ত হয়ে গিয়েছিল। তাই উদ্ধারকাজ সহজ করতে নিয়ে আসা হয় ভারী যন্ত্রপাতি ও জেসিবি (এক্সকাভেটর)। উৎসুক জনতা ও পুলিশের উপস্থিতিতে শুরু হয় শ্বাসরুদ্ধকর উদ্ধার অভিযান।

প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলে এই অভিযান। ড্রেনের ঢাকনা সরিয়ে টনকে টন আবর্জনা, কাদা ও দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা বাইরে বের করে আনা হয়। ড্রেনটি কার্যত নতুনের মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। উদ্ধারকারী দল ড্রেনের প্রতিটি কোণ তন্নতন্ন করে খোঁজে। কিন্তু দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর দেখা যায়, ড্রেনে কোনো শিশুর অস্তিত্ব নেই। এমনকি কোনো খেলনা বা শিশুর ব্যবহারের সামগ্রিও পাওয়া যায়নি।


উদ্ধার অভিযানের শেষ পর্যায়ে এসে পুলিশ ও উদ্ধারকারী দলের সন্দেহ জাগে। তারা স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে জানতে চান, কার শিশু নিখোঁজ হয়েছে বা কেউ কোনো শিশুকে ড্রেনের কাছে খেলতে দেখেছিল কি না। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে এলাকার কেউ কোনো শিশু নিখোঁজের কথা জানাতে পারেননি। কোনো পরিবারও এগিয়ে আসেনি তাদের সন্তান হারিয়েছে দাবি করে।

পরবর্তীতে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, পুরো বিষয়টি ছিল ওই নারীর সাজানো নাটক। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে বেরিয়ে আসে আসল সত্য। জানা যায়, ওই এলাকার ড্রেনটি দীর্ঘদিন ধরে ময়লায় জ্যাম হয়ে ছিল। বর্ষাকালে ড্রেনের পানি উপচে রাস্তায় চলে আসত এবং অসহনীয় দুর্গন্ধ ছড়াত। মশা-মাছির উপদ্রবে এলাকাবাসীর জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু বারবার অভিযোগ জানিয়েও কোনো সুরাহা মেলেনি। তাই প্রশাসনের টনক নড়াতে ওই নারী এই মিথ্যার আশ্রয় নেন।


ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর প্রশাসনের কর্মকর্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মীরাট পৌরসভার এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, “একটি মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে আমাদের বিশাল জনবল ও যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হয়েছে। এতে সরকারি অর্থের অপচয় হয়েছে এবং প্রকৃত জরুরি সেবার কাজে বিঘ্ন ঘটেছে।”

প্রশাসনের দাবি, ওই এলাকার ড্রেন পরিষ্কারের বিষয়ে তাদের কাছে কোনো ‘আনুষ্ঠানিক লিখিত অভিযোগ’ ছিল না। তারা বলেন, নিয়ম অনুযায়ী অভিযোগ জানালে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হতো। কিন্তু শিশু নিখোঁজের মতো গুরুতর মানবিক বিষয় নিয়ে মিথ্যা বলা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হতে পারে।

অন্যদিকে, স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশাসনের এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাদের মতে, লিখিত ও মৌখিক—উভয়ভাবেই বহুবার ড্রেন পরিষ্কারের অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু পৌরসভা তাতে কর্ণপাত করেনি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রতিবেশী বলেন, “ওই নারী যা করেছেন, তা হয়তো আইনত ঠিক নয়, কিন্তু নৈতিকভাবে তিনি আমাদের সবার উপকার করেছেন। প্রশাসন যদি তাদের কাজ ঠিক সময়ে করত, তবে তাকে এই মিথ্যার আশ্রয় নিতে হতো না।”


ঘটনার ভিডিও এবং সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেটিজেনদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ নারীর এই ‘মরিয়া পদক্ষেপ’কে সমর্থন করছেন, আবার কেউ কেউ একে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে অভিহিত করছেন।

ফেসবুক ও এক্সে (সাবেক টুইটার) অনেকে মন্তব্য করেছেন:

  • রাহুল শর্মা নামের একজন লিখেছেন: “আধুনিক সমস্যার আধুনিক সমাধান! ভারতে সরকারি কাজ করানোর জন্য এটাই হয়তো একমাত্র পথ। ওই নারীকে পুরস্কৃত করা উচিত।”
  • প্রিয়াঙ্কা দাস মন্তব্য করেন: “প্রশাসনের গাফিলতি ঢাকতে এখন তারা নারীর দোষ খুঁজছে। ড্রেন পরিষ্কার করা তাদের দায়িত্ব ছিল, তারা সেটা পালন করেনি কেন?”
  • বিপরীত মত পোষণ করে অনিক রায় লিখেছেন: “বিষয়টি মজার মনে হলেও এটি বিপজ্জনক। পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস যখন এখানে ব্যস্ত ছিল, তখন শহরের অন্য কোথাও হয়তো সত্যিকারের অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারত। জরুরি সেবা নিয়ে ছেলেখেলা করা উচিত নয়।”


পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জরুরি সেবার অপব্যবহার এবং ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত করার অভিযোগে ওই নারীর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করছেন। তারা বলছেন, এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলেও এর পেছনের কারণ—নাগরিক সেবায় অবহেলা—উপেক্ষা করার মতো নয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন