হাসিনার পতন ও তারেক রহমানের হাত ধরে, বিএনপির রাজকীয় প্রত্যাবর্তন

মাত্র দুই বছর আগেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনা যখন কারচুপির অভিযোগে অভিযুক্ত এক প্রক্রিয়ায় জয়ী হয়েছিলেন, তখন কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবতে পারেননি যে তার দীর্ঘ ১৫ বছরের লৌহমানবী শাসনের অবসান এত দ্রুত ঘটবে। একইভাবে, একসময়ের কোণঠাসা এবং কার্যত বাতিলের খাতায় চলে যাওয়া রাজনৈতিক দল বিএনপি যে এত বিপুল জনসমর্থন নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসবে, তা ছিল কল্পনারও অতীত।

তবে সেই অসম্ভবই আজ বাস্তবে রূপ নিয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসিতে প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক পালাবদল এবং আগামীর চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশের রাজনীতির দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত চক্রে এটি শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যে ক্ষমতার আরও একটি ঐতিহাসিক হাতবদল। গত কয়েক দশক ধরে মূলত এই দুটি প্রধান দলই পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ শাসন করে আসছে। তবে এবারের প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন।

২০২৪ সালের ‘জুলাই অভ্যুত্থান’-এর মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার পতন এবং পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুই বছরের শাসনের পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়। এবারের নির্বাচনে বিশেষত্ব হলো, এই প্রথম বিএনপির নতুন কাণ্ডারি তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন এবং তিনি প্রথমবারের মতো জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে সরকার গঠনের পথে হাঁটছেন।

বিএনপির এই বিজয়ের নেপথ্যে দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান (বর্তমানে পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান) তারেক রহমানের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত বছরের শেষ দিকে তার মা এবং বিএনপির দীর্ঘদিনের কাণ্ডারি বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের একক দায়িত্ব তার কাঁধে এসে পড়ে।

বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘ চার দশক দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর তিনি গৃহবধূ থেকে রাজনীতির মাঠে এসে দলের হাল ধরেছিলেন। মায়ের মৃত্যুর মাত্র পাঁচ দিন আগে দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বেচ্ছানির্বাসন শেষে লন্ডন থেকে দেশে ফেরেন তারেক রহমান।

মায়ের শাসনামলে তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ এবং রাজনৈতিক অপপ্রচারের বিষয়টি উল্লেখ করে বিবিসি জানায়, ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান এতদিন লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি দলের ‘ডি-ফ্যাক্টো’ বা অঘোষিত নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে রাষ্ট্রপরিচালনায় তিনি কতটা দক্ষ, তা এখনো পরীক্ষিত নয়।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নাভীন মুর্শিদ বিবিসিকে বলেন, “পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকাটা তারেক রহমানের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কারণ, মানুষ সব সময় পরিবর্তনের সুযোগ দিতে চায়। তারা ভাবতে চায়, নতুন ও ভালো কিছু করা প্রকৃতপক্ষেই সম্ভব। তাই তাকে নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক আশা রয়েছে।”

বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে শেখ হাসিনার পতন ঘটানো ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ। তরুণ প্রজন্ম, যারা এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছিল, তারা আর পুরোনো ধারার বা কর্তৃত্ববাদী রাজনীতি মেনে নিতে রাজি নয়।

অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া ১৯ বছর বয়সী তরুণ তাজিন আহমেদ বলেন, “আমরা আর লড়াই করতে চাই না। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর পতন হওয়া আমাদের চূড়ান্ত বিজয় ছিল না। দেশ যখন কোনো দুর্নীতি ছাড়া চলবে ও অর্থনীতি ভালো হবে, সেটাই হবে আমাদের মূল বিজয়।”

একই সুরে কথা বলেছেন তাজিনের ২১ বছর বয়সী স্বজন তাহমিনা তাসনিম। তিনি বলেন, “প্রথমেই আমরা মানুষের মধ্যে ঐক্য চাই। আমাদের একটি স্থিতিশীল দেশ ও অর্থনীতি পাওয়ার অধিকার আছে। আমরা অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছি এবং জানি কীভাবে লড়াই করতে হয়। তাই, যদি একই ঘটনার (স্বৈরাচারী শাসন) পুনরাবৃত্তি হয়, আমরা আবার রাস্তায় নামার অধিকার রাখি।”

তরুণদের এই বক্তব্য স্পষ্ট করে দেয় যে, নতুন সরকারের জন্য পথচলা খুব একটা মসৃণ হবে না। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ না হলে ফের আন্দোলনের মুখে পড়ার শঙ্কা থেকেই যায়।

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিবিসিকে জানিয়েছিলেন, তাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা। তিনি বলেন, “গত এক দশকে যেসব গণতান্ত্রিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে, সেগুলো আমাদের আগে ঠিক করতে হবে।”

তবে বিবিসি মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে প্রতিশ্রুতি দেওয়া এবং ক্ষমতায় গিয়ে তা ভঙ্গ করার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। বিজয়ী দলগুলো ক্ষমতায় আসার পর ক্রমেই কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠে।

নতুন সরকারের সামনে এখন পাহাড়সম চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে প্রধান হলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা, যা ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় কিছুটা অস্থিতিশীল ছিল। এছাড়া ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, খাদ্যদ্রব্যের লাগামহীন দাম কমানো এবং বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে তারেক রহমানের সরকারের জন্য অগ্নিপরীক্ষা।

এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য দিক হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উত্থান। বাংলাদেশের ইতিহাসে দুবার নিষিদ্ধ হওয়া এই ইসলামপন্থী দলটি এবার উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আসনে জয় পেয়েছে। বিশেষ করে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে গঠিত ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি)—যারা জামায়াতের জোটসঙ্গী—তাদের প্রথম নির্বাচনেই ছয়টি আসনে জয়ী হওয়াকে বড় চমক হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

সমাজবিজ্ঞানী সামিনা লুৎফা বলেন, “আমরা সংসদে এমন সব নেতাদের দেখতে যাচ্ছি, যারা আগে কখনো সংসদে যাননি। এনসিপির তরুণদের অনেক কিছু শেখার আছে। অন্যরা অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হলেও তাঁদের দেশ চালানোর অভিজ্ঞতা নেই। তাই এটি একটি কঠিন কাজ হতে যাচ্ছে।”

জামায়াতে ইসলামীর এবারের নির্বাচনী ইশতেহার ছিল ধর্মনিরপেক্ষ ও উন্নয়নমুখী, যেখানে সরাসরি ইসলামি আইনের উল্লেখ ছিল না। তবে নাভীন মুর্শিদ সতর্ক করে বলেন, “জামায়াত একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক দল। তৃণমূল পর্যায়ে তাদের দীর্ঘদিনের কাজের ফসল এই ফলাফল। তবে তাদের আদর্শিক ভিত্তি এবং ‘গণতন্ত্রবিরোধী ও পিতৃতান্ত্রিক’ তকমা এখনো অনেক মানুষের উদ্বেগের কারণ।”

নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি এবং দলটিকে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতার ওপর একটি ছায়া ফেলেছে বলে বিবিসি উল্লেখ করেছে। ভারত থেকে শেখ হাসিনা গত বৃহস্পতিবারের এই নির্বাচনকে ‘প্রতারণা ও প্রহসনের’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং নতুন নির্বাচনের দাবি জানিয়েছেন।

তবে আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার প্রশ্নে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, “এটি আমাদের সিদ্ধান্তের বিষয় নয়। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় ফিরতে সময় লাগবে। কারণ, তাদের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। যখন আপনি আপনার নিজের দেশের মানুষকে হত্যা, নৃশংসতা ও নিপীড়ন করার অভিযোগে অভিযুক্ত হবেন, তখন ভবিষ্যতে দেশের রাজনীতিতে তাদের অবস্থান কোথায় হবে, তা জনগণই ঠিক করবে।”

পরিশেষে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠন করতে যাচ্ছে সত্য, কিন্তু তাদের সামনে রয়েছে একটি ক্ষতবিক্ষত রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের গুরুদায়িত্ব। তরুণ প্রজন্মের সতর্কবার্তা এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে তারা কতটা সফল হতে পারেন, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন