ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কুমিল্লা-৪ (দেবিদ্বার) আসনে এক অভূতপূর্ব ও ঐতিহাসিক বিজয়ের রেকর্ড গড়েছেন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) অন্যতম শীর্ষ নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের অন্যতম এই সমন্বয়ক তার নির্বাচনী এলাকার ১১৬টি কেন্দ্রের সবকটিতেই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর চেয়ে বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। দেবিদ্বারের রাজনৈতিক ইতিহাসে এমন একচেটিয়া আধিপত্য ও ‘ক্লিন সুইপ’ বিজয় অতীতে খুব কমই দেখা গেছে।
বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) রাতে উপজেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে ঘোষিত বেসরকারি ফলাফলে দেখা যায়, ‘শাপলা কলি’ প্রতীক নিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীকে প্রায় দেড় লক্ষাধিক ভোটের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। এই ফলাফলের মধ্য দিয়ে দেবিদ্বারের রাজনীতিতে তরুণ নেতৃত্বের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।
উপজেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত চূড়ান্ত বেসরকারি ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেবিদ্বার উপজেলার মোট ১১৬টি ভোটকেন্দ্রের প্রতিটিতেই হাসনাত আব্দুল্লাহর বাক্সে পড়েছে সর্বোচ্চ ভোট। সাধারণত নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হলে বিভিন্ন কেন্দ্রে ফলাফলের ভিন্নতা দেখা যায়, কিন্তু হাসনাত আব্দুল্লাহর ক্ষেত্রে চিত্রটি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ফলাফল অনুযায়ী, শাপলা কলি প্রতীকে হাসনাত আব্দুল্লাহ পেয়েছেন ১ লাখ ৭২ হাজার ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী, বিএনপি সমর্থিত ও গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. আ. জসিম উদ্দিন ‘ট্রাক’ প্রতীকে পেয়েছেন মাত্র ২৬ হাজার ভোট। ভোটের ব্যবধান দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার, যা এই আসনের ইতিহাসে অন্যতম বড় ব্যবধানের জয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ইটিসি বাংলাকে বলেন, “একটি সংসদীয় আসনের প্রতিটি কেন্দ্রে একজন প্রার্থীর জয়লাভ করা অত্যন্ত বিরল ঘটনা। এটি প্রমাণ করে যে, ওই প্রার্থীর জনসমর্থন কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং সমগ্র উপজেলায় তার জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী।”
হাসনাত আব্দুল্লাহর এই ভূমিধস বিজয়ের পেছনে মূল কারণ হিসেবে তার অতীত ভূমিকা এবং তরুণ প্রজন্মের অকুণ্ঠ সমর্থনকে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় তার সাহসী নেতৃত্ব তাকে জাতীয় পর্যায়ের নেতায় পরিণত করেছিল। বিশেষ করে দেবিদ্বারের তরুণ ভোটারদের কাছে তিনি ছিলেন পরিবর্তনের প্রতীক।
নির্বাচনী প্রচারণার শুরু থেকেই হাসনাত আব্দুল্লাহর জনসভায় মানুষের ঢল নামতে দেখা গেছে। প্রথাগত রাজনীতির বাইরে এসে তিনি সাধারণ মানুষের কথা বলেছেন, যা ভোটারদের আকৃষ্ট করেছে। বিশেষ করে, শাপলা কলি প্রতীকের পক্ষে যে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল, তা ভোটের ফলাফলে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। দেবিদ্বারের প্রবীণ ভোটাররা বলছেন, “আমরা এমন ভোট বহুদিন দেখিনি, যেখানে দল-মত নির্বিশেষে মানুষ একজন তরুণকে ভোট দেওয়ার জন্য এতটা উদগ্রীব ছিল।”
কুমিল্লা-৪ আসনটি এবার সারা দেশের মধ্যে অন্যতম আলোচিত ও গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছিল। নির্বাচনের আগে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থীর প্রার্থিতা আইনি জটিলতায় বাতিল হয়ে যাওয়ায় এই আসনে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি হয়। বিএনপি সমর্থিত ও গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী মো. আ. জসিম উদ্দিন ট্রাক প্রতীক নিয়ে মাঠে নামলেও হাসনাত আব্দুল্লাহর জনপ্রিয়তার ঝড়ে তিনি টিকতে পারেননি।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বিএনপির মূল প্রার্থী না থাকায় এবং হাসনাত আব্দুল্লাহর ব্যক্তিগত ইমেজের কারণে বিএনপির সাধারণ ভোটারদের একটি বড় অংশও শাপলা কলিতে ভোট দিয়েছেন। এছাড়া এনসিপি ও ১১ দলীয় জোটের সাংগঠনিক তৎপরতাও এই জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে। ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী জসীমউদ্দীন মাত্র ২৬ হাজার ভোট পাওয়ায় এটি স্পষ্ট যে, দেবিদ্বারের মানুষ এবার গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে নতুন নেতৃত্বকেই বেছে নিয়েছেন।
ফলাফল ঘোষণার পর বৃহস্পতিবার রাতেই দেবিদ্বারের বিভিন্ন এলাকায় আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। হাজার হাজার সমর্থক রাস্তায় নেমে ‘শাপলা কলি’ স্লোগানে পুরো এলাকা মুখরিত করে তোলেন। তবে বিশাল বিজয়ের পরেও রাজনৈতিক পরিপক্কতার পরিচয় দিয়েছেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ।
বিজয় নিশ্চিত হওয়ার পরপরই তিনি এক বার্তায় তার সমর্থকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি স্পষ্টভাবে নির্দেশ দেন যে, কোনো ধরনের বিজয় মিছিল বা আনন্দ শোভাযাত্রা করা যাবে না। পরাজিত প্রার্থীর কর্মী বা সমর্থকদের সঙ্গে কোনো প্রকার উসকানিমূলক আচরণ না করার জন্যও তিনি দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক করে দেন।
হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, “এই বিজয় দেবিদ্বারের সর্বস্তরের জনগণের। এটি কোনো নির্দিষ্ট দলের বা গোষ্ঠীর বিজয় নয়। আমাদের এখন দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে কাজ করতে হবে। বিজয় মিছিল করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করা আমাদের রাজনীতির অংশ নয়। শুকরিয়া আদায় করুন এবং শান্ত থাকুন।”
তার এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে নেতাকর্মীরা বড় কোনো শোডাউন থেকে বিরত থাকেন, যা এলাকার সচেতন মহলে প্রশংসিত হয়েছে। এটি জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ী জোটের নির্দেশনার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
হাসনাত আব্দুল্লাহর এই বিজয় শুধু একজন ব্যক্তির জয় নয়, বরং এটি দেবিদ্বারের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত। দীর্ঘদিনের পারিবারিক বা বংশগত রাজনীতির বাইরে এসে একজন সাবেক ছাত্রনেতা যেভাবে মানুষের ম্যান্ডেট পেয়েছেন, তা ভবিষ্যতে অন্য তরুণদেরও রাজনীতিতে আসতে উদ্বুদ্ধ করবে।
১১ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে হাসনাত আব্দুল্লাহ সংসদে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের পাশাপাশি সারা দেশের তরুণদের প্রতিনিধিত্ব করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেবিদ্বারের অবকাঠামগত উন্নয়নে তিনি কী ভূমিকা রাখেন, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে তার নির্বাচনী এলাকার মানুষ।
সব কেন্দ্র জয়ের রেকর্ড গড়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রমাণ করেছেন, সততা ও সাহসিকতা থাকলে রাজনীতিতে অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়। ১ লাখ ৭২ হাজার ভোটের এই রায় তার ওপর জনগণের পাহাড়সম প্রত্যাশারই বহিঃপ্রকাশ। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে কনিষ্ঠ কিন্তু প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে তার পথচলা কেমন হয়, তা দেখার অপেক্ষায় এখন পুরো দেশ। তবে অন্তত দেবিদ্বারের মানুষ আজ বিশ্বাস করছে, তারা সঠিক নেতৃত্বই বেছে নিয়েছে।
