বিশ্বজুড়ে এখন একটাই আলোচনার বিষয়—‘জেফ্রি এপস্টেইন ফাইল’। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আদালত কর্তৃক উন্মুক্ত করা এই নথিপত্র যেন এক প্যান্ডোরার বাক্স খুলে দিয়েছে। রাজনীতি, বিজ্ঞান, এবং বিনোদন জগতের এমন সব হেভিওয়েট ব্যক্তিত্বের নাম এই কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িয়েছে, যা দেখে রীতিমতো স্তম্ভিত বিশ্ববাসী। যাদের একসময় আইকন বা আদর্শ মানা হতো, তারাই ডুবে ছিলেন অন্ধকার জগতের এক করাল মায়াজালে। এই নথিপত্র ফাঁসের পর নড়েচড়ে বসেছে আন্তর্জাতিক মিডিয়া, আর এর উত্তপ্ত আঁচ এসে পড়েছে ভারতীয় শোবিজ অঙ্গনেও। বলিউডের স্পষ্টবক্তা অভিনেত্রী কঙ্গনা রানাউত এই ইস্যুতে নিজের দীর্ঘ দিনের জমে থাকা ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন এবং সমাধানের পথ হিসেবে ভারতীয় কৃষ্টি ও সনাতন ধর্মের কথা উল্লেখ করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক দীর্ঘ ও আবেঘন পোস্টে কঙ্গনা রানাউত এপস্টেইন ফাইলে উঠে আসা তথ্যগুলোকে কেবল বিরক্তিকর নয়, বরং ‘যন্ত্রণাদায়ক’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি লিখেছেন, “এপস্টেইন ফাইলস সম্পর্কে পড়া এবং জানা সত্যিই খুব যন্ত্রণাদায়ক। অপরাধ সবখানেই ঘটে, কিন্তু এখানে অপরাধকে যেভাবে প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে এবং প্রভাবশালীরা যেভাবে এর সঙ্গে যুক্ত, তাতে মনে হচ্ছে এটা যেন কোনো ফ্যাশন বা অভিজাততন্ত্রের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।”
কঙ্গনা তার পোস্টে নিজের ব্যক্তিগত হতাশার কথা তুলে ধরেছেন। ছোটবেলা থেকে যেসব আন্তর্জাতিক তারকা, সংগীতশিল্পী, রাজনীতিবিদ ও পরিচালকদের তিনি আইকন বা আদর্শ হিসেবে মেনে বড় হয়েছেন, তাদের এমন জঘন্য কর্মকাণ্ডে তিনি বাকরুদ্ধ। অভিনেত্রী বলেন, “ছোটবেলা থেকে আমরা যাদের দিকে তাকিয়ে থাকতাম, ভাবতাম তারা পৃথিবীকে সুন্দর করছে—সেই সব মানুষ কীভাবে অল্পবয়সী নারী ও শিশুদের ওপর এমন পাশবিক নির্যাতন চালাতে পারে, তা ভাবলে গা শিউরে ওঠে। বিখ্যাত ও ক্ষমতাশীল ব্যক্তিদের নিয়ে আমার ধারণা আজ পুরোপুরি বদলে গেছে। তাদের চকচকে জীবনের আড়ালে এমন অন্ধকার লুকিয়ে ছিল, তা অকল্পনীয়।”
বিশ্বের বর্তমান নৈতিক অবস্থা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর শঙ্কা প্রকাশ করেছেন কঙ্গনা। তার মতে, বস্তুবাদী সমাজব্যবস্থা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার মানুষকে দানবে পরিণত করেছে। তিনি লিখেছেন, “আমি খুব হতাশ। এই তথাকথিত আধুনিক বিশ্বের ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি কোনো আশা খুঁজে পাচ্ছি না।”
তবে হতাশার মধ্যেও তিনি সমাধানের আলো দেখতে পাচ্ছেন প্রাচ্যের চিরায়ত দর্শনে। কঙ্গনা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, ভারত তথা সনাতন ধর্মই এই নৈতিক অবক্ষয় থেকে বিশ্বকে রক্ষা করতে পারে। তিনি তার পোস্টে উল্লেখ করেন, “আমি নিশ্চিত, ভারতের কৃষ্টি-কালচার, মূল্যবোধ এবং সনাতন ধর্মই হলো সেই সমাধান, যা আজ সারা বিশ্ব খুঁজছে। আমাদের পারিবারিক বন্ধন, আধ্যাত্মিকতা এবং ত্যাগের মহিমাই পারে মানুষকে আবার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে।”
কঙ্গনা রানাউত বর্তমান পরিস্থিতিকে ভারতীয় পুরাণের ‘সুর ও অসুর’ বা ‘দেবতা ও রাক্ষস’-এর চিরন্তন লড়াইয়ের সঙ্গে তুলনা করেছেন। তার মতে, পুরাণের সেই গল্পগুলো আজ যেন জীবন্ত হয়ে চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। তিনি বলেন, “আমাদের পুরাণের সুর-অসুর আর দেবতা-রাক্ষসের যুদ্ধের কাহিনীগুলো কেবল গল্প নয়, বরং সত্য। আজ সেই যুদ্ধই আবার শুরু হয়েছে। এখন মানুষকে বেছে নিতে হবে তারা ঈশ্বরের পক্ষে থাকবে নাকি দানবদের দলে যোগ দেবে। এই এপস্টেইন ফাইল প্রমাণ করে যে, দানবরা আমাদের আশেপাশেই ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে।”
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ্য, কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইন এবং তার সহযোগী ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েল সংক্রান্ত মামলার নথিপত্র সম্প্রতি প্রকাশ করতে শুরু করেছে মার্কিন বিচার বিভাগ। প্রায় ৩০ লাখের বেশি পৃষ্ঠার এই বিশাল নথিতে রয়েছে শত শত ইমেইল, ব্যক্তিগত ডায়েরির অংশ, ফ্লাইট লগ এবং কয়েক হাজার ছবি। এই সব নথিতে উঠে এসেছে প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট, ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য, অস্কারজয়ী অভিনেতা এবং বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের নাম।
যদিও তালিকায় নাম থাকা মানেই কেউ সরাসরি অপরাধী প্রমাণিত হন না, তবুও এপস্টেইনের মতো একজন দণ্ডপ্রাপ্ত যৌন অপরাধীর সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ মেলামেশা এবং ব্যক্তিগত দ্বীপে যাতায়াত বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় তুলেছে। নথিতে থাকা তথ্যগুলোর মাধ্যমে অনেক ভুক্তভোগীর নাম ও পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে, যা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
নথিতে অন্তত ১০০ জন ভুক্তভোগীর জবানবন্দি এবং তথ্য রয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন যে, এই তথ্যগুলো জনসম্মুখে প্রকাশ করার ফলে তারা সামাজিকভাবে অত্যন্ত বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন। তাদের মতে, বিচার পাওয়ার বদলে তাদের নাম প্রকাশ্যে আসায় তারা পুনরায় ট্রমার শিকার হচ্ছেন। বিচার বিভাগের এই সিদ্ধান্ত নিয়েও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে।
জেফ্রি এপস্টেইনের এই কেলেঙ্কারি কেবল আমেরিকার বা পশ্চিমাদের সমস্যা নয়, এটি বৈশ্বিক ক্ষমতা কাঠামোর এক নগ্ন রূপ প্রকাশ করেছে। কঙ্গনা রানাউতের মন্তব্য এই বিতর্কে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, চাকচিক্যময় উন্নতির আড়ালে যদি নৈতিকতা হারিয়ে যায়, তবে সেই সভ্যতা টিকতে পারে না। এখন দেখার বিষয়, এই বিশাল কেলেঙ্কারির পর বিশ্বনেতারা এবং সাংস্কৃতিক জগত তাদের হারানো বিশ্বাসযোগ্যতা কীভাবে ফিরিয়ে আনে, নাকি কঙ্গনার ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী বিশ্ব সত্যিই এক গভীর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হবে।
