দেশের ক্রিকেটে নতুন যুগের সূচনা: এপ্রিলেই মাঠে গড়াচ্ছে নারীদের প্রথম বিপিএল, প্লেয়ার্স ড্রাফট ১৪ মার্চ

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে, বিশেষ করে ক্রিকেটের গৌরবময় ইতিহাসে রচিত হতে যাচ্ছে এক নতুন এবং ঐতিহাসিক অধ্যায়। দীর্ঘ প্রতীক্ষা, জল্পনা-কল্পনা এবং নানা আলোচনার পর অবশেষে প্রথমবারের মতো নারীদের জন্য ‘বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ’ বা উইমেন্স বিপিএল (Women’s BPL) আয়োজন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। দেশের নারী ক্রিকেটারদের দীর্ঘদিনের একটি প্রাণের দাবি ছিল নিজেদের জন্য একটি ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক টি-টোয়েন্টি লিগের। সেই দাবি পূরণের পথেই এবার শক্ত কদমে হাঁটল দেশের ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। পুরুষদের বিপিএলের আদলে নারীদের এই টুর্নামেন্টটি দেশের ক্রিকেটে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে মনে করছেন ক্রীড়া বিশ্লেষকরা। আগামী ৪ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে এই জমজমাট ক্রিকেট মহাযজ্ঞ। আর এর আগে, অংশগ্রহণকারী দলগুলো তাদের পছন্দের খেলোয়াড়দের দলে ভেড়ানোর জন্য আগামী ১৪ মার্চ অত্যন্ত আকর্ষণীয় প্লেয়ার্স ড্রাফটে অংশ নেবে।


নারীদের এই প্রথম বিপিএল আসরটি প্রাথমিকভাবে তিনটি ফ্র্যাঞ্চাইজি দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হবে। যেহেতু এটি প্রথম আসর, তাই বোর্ড খুব সতর্কতার সাথে এবং পরিমিত পরিসরে টুর্নামেন্টটি শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যাতে করে এর গুণগত মান ও পেশাদারিত্ব শতভাগ বজায় রাখা সম্ভব হয়। টুর্নামেন্টকে সফল ও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্য বিসিবি দেশের দুটি অন্যতম সেরা ও ঐতিহাসিক ভেন্যুকে নির্বাচন করেছে। ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হবে ‘হোম অব ক্রিকেট’ খ্যাত ঢাকার মিরপুর শেরে-ই-বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামের শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান স্টেডিয়ামে। এই দুটি ভেন্যুতে খেলা আয়োজনের মাধ্যমে বিসিবি মূলত নারী ক্রিকেটকে দেশের প্রধান ক্রিকেট কেন্দ্রগুলোতে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ঢাকার মিরপুরে খেলা হওয়ার অর্থ হলো, এখানে মিডিয়া কভারেজ এবং দর্শকদের উপস্থিতির সুযোগ থাকবে অনেক বেশি, যা নারী ক্রিকেটারদের উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা জোগাতে ব্যাপক ভূমিকা পালন করবে।


যেকোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগের মূল আকর্ষণগুলোর একটি হলো বিশ্বমানের বিদেশি তারকা ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণ। বিসিবি নারীদের এই বিপিএলকেও আন্তর্জাতিক মানের এবং অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে বিদেশি ক্রিকেটার অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে ব্যাপক ও যুগান্তকারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। বিসিবির নারী বিভাগের বর্তমান চেয়ারম্যান রুবাবা দৌলা এ প্রসঙ্গে অত্যন্ত ইতিবাচক ও গঠনমূলক বার্তা দিয়েছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, বিদেশি খেলোয়াড় চুক্তিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে বিসিবির পক্ষ থেকে নির্দিষ্ট কোনো দেশের জন্য আলাদা কোনো বিধিনিষেধ বা কড়াকড়ি থাকছে না। অর্থাৎ, যে তিনটি ফ্র্যাঞ্চাইজি এই টুর্নামেন্টে অংশ নেবে, তারা তাদের পছন্দমতো যেকোনো দেশের তারকা ক্রিকেটারের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করে চুক্তি সম্পন্ন করতে পারবে। রুবাবা দৌলা অত্যন্ত আশাবাদী কণ্ঠে আরও জানান, ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন বিশ্বমানের আন্তর্জাতিক নারী তারকা এই লিগে খেলার ব্যাপারে তাদের প্রবল আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বিদেশি খেলোয়াড়রা যখন আমাদের দেশের স্থানীয় তরুণ প্রতিভাদের সাথে ড্রেসিংরুম শেয়ার করবেন, তখন আমাদের মেয়েদের দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস এবং পেশাদারিত্ব এক ভিন্ন উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে বোর্ড।


বিদেশি ক্রিকেটারদের লিগে অন্তর্ভুক্তির প্রসঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই প্রতিবেশী দেশ ভারতের নারী ক্রিকেটারদের প্রসঙ্গটি সামনে চলে আসে। ক্রিকেট বিশ্বে ভারতীয় ক্রিকেট নিয়ন্ত্রণ বোর্ড বা বিসিসিআইয়ের (BCCI) একটি কড়া নিয়ম রয়েছে যে, তারা তাদের চুক্তিবদ্ধ কোনো পুরুষ ক্রিকেটারকে বিপিএল, বিগ ব্যাশ বা অন্য কোনো বিদেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে অংশ নিতে দেয় না। তবে আশার কথা হলো, নারী ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে বিসিসিআইয়ের এই ধরনের কোনো কঠোর বিধিনিষেধ বা আইনি বাধা নেই। যার ফলে ভারতের স্মৃতি মান্দানা, হরমনপ্রিত কৌর কিংবা শেফালি ভার্মার মতো বিশ্বকাঁপানো নারী ক্রিকেটারদের বাংলাদেশের এই ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে অংশগ্রহণের একটি তাত্ত্বিক সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি কিছুটা জটিল। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক ক্রিকেটীয় সম্পর্কে কিছুটা টানাপোড়েন এবং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক নানামুখী সমীকরণের কারণে ভারতীয় তারকাদের বাংলাদেশে আসা নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তার মেঘ রয়েই গেছে। তারপরেও ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলো যদি তাদের সাথে সফলভাবে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারে, তবে হয়তো এই টুর্নামেন্টেই ভারতীয় তারকাদের ঝলক দেখা যেতে পারে, যা এই আসরের জৌলুস বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।


আগামী ১৪ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য প্লেয়ার্স ড্রাফট নিয়ে ইতোমধ্যে দেশের ক্রিকেট অঙ্গনে সাজ সাজ রব পড়ে গেছে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ড্রাফটে মোট চারটি ক্যাটাগরিতে দেশি-বিদেশি খেলোয়াড়দের রাখা হবে। দলগুলোর ভারসাম্য এবং প্রতিযোগিতার মান সমতা পর্যায়ে বজায় রাখার জন্য দেশের শীর্ষ তিনজন নারী ক্রিকেটারকে ‘আইকন’ খেলোয়াড় হিসেবে নির্বাচিত করা হয়েছে। এই তিনজন আইকন ক্রিকেটার তিনটি আলাদা দলের নেতৃত্বভার গ্রহণ করবেন। আইকন ক্যাটাগরির এই দেশি খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিকের একটি সম্মানজনক সীমারেখা নির্ধারণ করে দিয়েছে বোর্ড। তাদের জন্য সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা হয়েছে ১০ লাখ টাকা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারী ক্রিকেটারদের জন্য এটি একটি অত্যন্ত ইতিবাচক, সম্মানজনক ও যুগান্তকারী পারিশ্রমিক কাঠামো। এর মাধ্যমে বোর্ড দেশের নারী ক্রিকেটারদের আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করার এবং ক্রিকেটের প্রতি তাদের আরও বেশি মনোনিবেশ করার একটি চমৎকার সুযোগ তৈরি করে দিচ্ছে।


বাংলাদেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের ইতিহাসে পুরুষদের বিপিএল নিয়ে বরাবরই নানা ধরনের নেতিবাচক আলোচনা ও সমালোচনা লেগেই থাকে। বিশেষ করে খেলোয়াড়দের পারিশ্রমিক বকেয়া থাকা, ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর অব্যবস্থাপনা এবং পেশাদারিত্বের চরম অভাব নিয়ে প্রতি বছরই গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়। তবে নারীদের এই প্রথম আসরের ক্ষেত্রে আয়োজকরা এবং বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে বদ্ধপরিকর। বিসিবির শীর্ষ কর্মকর্তারা বারবার জোর দিয়ে বলেছেন যে, পুরুষদের আসরে পারিশ্রমিক–সংক্রান্ত যে সমস্ত অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক দেখা যায়, মেয়েদের এই আসরে তার বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়তে দেওয়া হবে না। নারীদের বিপিএলকে অত্যন্ত সুষ্ঠু, স্বচ্ছ এবং শতভাগ পেশাদারভাবে আয়োজন করার জন্য সব ধরনের পূর্বপ্রস্তুতি সম্পন্ন করা হচ্ছে। আর্থিক বিষয়গুলোর কড়া তদারকি করবে খোদ ক্রিকেট বোর্ড, যাতে কোনো নারী ক্রিকেটারকে তার প্রাপ্য পারিশ্রমিক নিয়ে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হতে না হয়।


সব মিলিয়ে, প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নারীদের এই বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ দেশের নারী ক্রিকেটে একটি সত্যিকারের পেশাদার কাঠামো গড়ে তোলার পথে সবচেয়ে বড় ও যুগান্তকারী একটি পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশের নারী ক্রিকেটাররা দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক আঙিনায় নিজেদের মেধার প্রমাণ করে আসছেন। এবার নিজেদের মাটিতে, নিজেদের দর্শকদের সামনে, ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের এই গ্ল্যামারাস এবং প্রতিযোগিতামূলক মঞ্চে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের পালা। নারী ক্রিকেটকে এগিয়ে নেওয়ার এই মহতী উদ্যোগ দেশের অগণিত তরুণীকে ভবিষ্যতে ক্রিকেটকে পেশা হিসেবে বেছে নিতে উৎসাহিত করবে। ইটিসি বাংলার ক্রীড়া ডেস্ক এই ঐতিহাসিক টুর্নামেন্টের প্রতিটি বল, প্রতিটি ম্যাচ এবং এর নেপথ্যের সব রোমাঞ্চকর খবর সম্মানিত পাঠকদের কাছে দ্রুততম সময়ে পৌঁছে দিতে সম্পূর্ণ প্রস্তুত। ক্রিকেটপ্রেমী বাঙালি এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে আগামী ৪ এপ্রিলের সেই মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য, যেদিন মিরপুরের সবুজ গালিচায় বাউন্ডারি আর ওভার বাউন্ডারির রোমাঞ্চ নিয়ে হাজির হবেন আমাদের দেশের এবং বিদেশের বিশ্বমানের নারী ক্রিকেটাররা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন