‘ইনশাআল্লাহ, আগামীর বাংলাদেশ ইনসাফের বাংলাদেশ, ইনকিলাব জিন্দাবাদ’: জামায়াতে ইসলামীর আমির

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে একটি নির্দিষ্ট স্লোগানকে কেন্দ্র করে নতুন করে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। আর সেই স্লোগানটি হলো— ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’। সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর এই স্লোগান বিরোধী বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সদ্য গঠিত রাজনৈতিক শক্তির তরুণ নেতা থেকে শুরু করে দেশের অন্যতম বৃহৎ ইসলামি দলের শীর্ষ নেতা পর্যন্ত সবাই যেন এক কাতারে এসে এই স্লোগানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর পর এবার একই ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তার দেওয়া দুই বাক্যের একটি সংক্ষিপ্ত ফেসবুক স্ট্যাটাস মুহূর্তের মধ্যেই নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়ে গেছে, যা দেশের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।


রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) ভোরে ফজর নামাজের পর পরই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তার ভেরিফায়েড ব্যক্তিগত ফেসবুক আইডিতে একটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ স্ট্যাটাস প্রদান করেন।

নিজের ভেরিফায়েড আইডিতে আমির শফিকুর রহমান লেখেন, ‘ইনশাআল্লাহ, আগামীর বাংলাদেশ ইনসাফের বাংলাদেশ। ইনকিলাব জিন্দাবাদ।’

মাত্র দুটি বাক্যের এই স্ট্যাটাসটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ইটিসি বাংলার এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত জামায়াত আমিরের ওই স্ট্যাটাসটিতে প্রায় পৌনে দুই লাখ (১ লাখ ৭৫ হাজার) রিয়্যাক্ট পড়েছে, যা তার জনপ্রিয়তার এবং দলটির কর্মী-সমর্থকদের সক্রিয়তার একটি বড় প্রমাণ। স্ট্যাটাসটি শেয়ার হয়েছে আড়াই হাজারের বেশি বার। একই সময়ের মধ্যে প্রায় ২২ হাজার ফেসবুক ব্যবহারকারী পোস্টটিতে নিজেদের মতামত জানিয়ে মন্তব্য (কমেন্ট) করেছেন।

মন্তব্যের ঘরে বেশিরভাগ নেটিজেনই জামায়াত আমিরের এই অবস্থানের প্রতি জোরালো সমর্থন জানিয়েছেন। অনেকেই মন্তব্য করেছেন যে, সরকারের মন্ত্রীরা যখন ভাষা ও সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে বিপ্লবের স্লোগানকে মুছে ফেলতে চাইছেন, তখন বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধভাবে এই স্লোগানকে ধারণ করা একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক বার্তা। সাধারণ সমর্থক থেকে শুরু করে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও এই পোস্ট নিয়ে নিজেদের ওয়ালে নানা ধরনের বিশ্লেষণধর্মী প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন।


এই পুরো ঘটনার এবং সামাজিক মাধ্যমের এই অভাবনীয় প্রতিবাদের সূত্রপাত ঘটে মূলত সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর একটি বিতর্কিত মন্তব্যকে কেন্দ্র করে। সম্প্রতি এক জনসভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে ফেব্রুয়ারি মাস এবং মাতৃভাষা বাংলার প্রসঙ্গ টেনে তিনি ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগানটির তীব্র সমালোচনা করেন।

মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু তার বক্তব্যে বলেন, “বাংলাকে যদি আমাদের হৃদয়ে ধারণ করতে হয়, বাংলা ভাষাকে যদি সত্যিকার অর্থে মায়ের ভাষা হিসেবে সম্মান করতে হয়, তাহলে এই দেশে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ স্লোগান চলবে না। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’, ‘ইনকিলাব মঞ্চ’—এসব শব্দের বা নামের সঙ্গে বাংলার কোনো সম্পর্ক নেই। যারা ১৯৫২ সালে আমাদের মুখের ভাষা কেড়ে নিতে চেয়েছিল, যারা আমাদের ওপর উর্দুকে চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, এগুলো মূলত তাদেরই ভাষা।”

মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর মুহূর্তেই রাজনৈতিক অঙ্গনে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। অনেকেই মনে করেন, মন্ত্রী সুকৌশলে দেশের তরুণ সমাজ এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যবহৃত বৈপ্লবিক স্লোগানকে ভাষা আন্দোলনের আবেগের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন।


মন্ত্রী টুকুর এই বক্তব্যের পর তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতারা চুপ করে বসে থাকেননি। সবার আগে এর কড়া ও নীরব প্রতিবাদ জানান কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসন থেকে সদ্য নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং নবগঠিত রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি (এনসিপি)-এর মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। একই সঙ্গে দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীও সামাজিক মাধ্যমে সরব হন।

তারা উভয়েই নিজেদের ফেসবুক প্রোফাইলে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে শুধু ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ লিখে পোস্ট করেন। তাদের এই স্ট্যাটাস প্রকাশের পরপরই তরুণ প্রজন্মের মাঝে তা ব্যাপকভাবে সাড়া ফেলে। হাসনাত ও নাসীরুদ্দীনের অনুসারীরা মন্ত্রীর বক্তব্যের সমালোচনা করে বলতে শুরু করেন যে, ‘ইনকিলাব’ (বিপ্লব) কোনো নির্দিষ্ট শোষক গোষ্ঠীর ভাষা হতে পারে না। এটি একটি সর্বজনীন শব্দ, যা যুগে যুগে অন্যায়, অবিচার ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে শোষিত মানুষের প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। তরুণ নেতাদের এই সাহসিকতাপূর্ণ স্ট্যাটাস দ্রুতই সামাজিক মাধ্যমে ট্রেন্ডিংয়ে পরিণত হয়।


রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের এই স্ট্যাটাসটি শুধু একটি সাধারণ ফেসবুক পোস্ট নয়; এর পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক সমীকরণ। হাসনাত আবদুল্লাহ এবং নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী যে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্ব করেন, তাদের সাথে জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত দলের আদর্শিক পার্থক্য থাকলেও, সরকারের একটি নির্দিষ্ট ন্যারেটিভ বা বয়ানের বিরুদ্ধে তারা আজ একই বিন্দুতে এসে দাঁড়িয়েছেন।

‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ একটি উর্দু ও ফারসি মিশ্রিত শব্দগুচ্ছ, যার বাংলা অর্থ ‘বিপ্লব দীর্ঘজীবী হোক’। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে উপমহাদেশের বিভিন্ন স্বাধিকার আন্দোলনে এই স্লোগানটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল। এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিশেষ করে বামপন্থি ও ইসলামপন্থি দলগুলো যুগ যুগ ধরে এই স্লোগান ব্যবহার করে আসছে। কিন্তু হঠাৎ করে ভাষা আন্দোলনের আবহে এই স্লোগানকে নিষিদ্ধ বা পরিত্যাজ্য করার যে সরকারি বয়ান তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে, তা বিরোধী শিবির কোনোভাবেই মেনে নিতে রাজি নয়।

জামায়াত আমিরের স্ট্যাটাসে ‘ইনসাফের বাংলাদেশ’ (ন্যায়বিচারের বাংলাদেশ) কথাটির সাথে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ জুড়ে দেওয়ার মাধ্যমে তিনি মূলত দেশবাসীকে এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন যে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য দেশে যে রাজনৈতিক বিপ্লবের প্রয়োজন, সেই বিপ্লবের স্লোগানকে ভাষার দোহাই দিয়ে আটকে রাখা যাবে না।


অবশ্য এই ঘটনার একটি ভিন্ন দিকও রয়েছে। সরকারি দলের সমর্থক ও কিছু ভাষাসৈনিক মনে করেন, মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু যৌক্তিক কথাই বলেছেন। তাদের মতে, স্বাধীন বাংলাদেশে যেখানে ‘জয় বাংলা’ বা ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’-এর মতো নিজস্ব স্লোগান রয়েছে, সেখানে ভিন্ন ভাষার একটি স্লোগানকে জাতীয় রাজনীতিতে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া মাতৃভাষার প্রতি এক ধরনের অবমূল্যায়ন। তারা হাসনাত আবদুল্লাহ এবং জামায়াত আমিরের এই অবস্থানের সমালোচনা করে বলছেন, সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্যই তারা এই উর্দুমূলীয় স্লোগানটিকে আঁকড়ে ধরেছেন।


সব মিলিয়ে, একটি মাত্র স্লোগানকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন এক মেরুকরণের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ এখন শুধু একটি স্লোগান নয়, বরং এটি সরকারের চাপিয়ে দেওয়া বয়ানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক শক্তিশালী হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। তরুণ ছাত্রনেতা থেকে শুরু করে প্রবীণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব—সবার কণ্ঠে একই স্লোগানের প্রতিধ্বনি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনীতিতে ‘ইনকিলাব’ বা বিপ্লবের ধারণা আরও জোরালোভাবে জায়গা করে নিতে যাচ্ছে। ইটিসি বাংলার বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই ভার্চুয়াল ঝড় খুব শিগগিরই রাজপথের রাজনীতিতেও নতুন উত্তাপ ছড়াবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন