জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায়, সাবেক মন্ত্রী আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হচ্ছে

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় ও রক্তক্ষয়ী অধ্যায় হলো ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান’। স্বৈরাচারী শাসনের অবসান এবং গণতান্ত্রিক অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে ছাত্র-জনতার এই স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়া এখন দেশের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। এই গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞ, দমন-পীড়ন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের দায়ে অভিযুক্ত হয়েছেন বিগত সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের একাধিক নেতা ও নীতিনির্ধারক। এরই ধারাবাহিকতায় আজ রোববার (২২ ফেব্রুয়ারি) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ বিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হতে যাচ্ছে।


দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া এবং নিবিড় তদন্তের পর গত ১০ ফেব্রুয়ারি প্রসিকিউশনের প্রারম্ভিক বক্তব্যের (Opening Statement) মধ্য দিয়ে এই যুগান্তকারী বিচারিক প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। প্রসিকিউশন প্যানেল ট্রাইব্যুনালের সামনে তুলে ধরেছেন কীভাবে বিগত সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের ব্যক্তিরা নিজেদের ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে দেশের সাধারণ ছাত্র-জনতার ওপর নিষ্ঠুর স্টিম রোলার চালিয়েছিলেন।

প্রসিকিউশনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও দাবি অনুযায়ী, জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অহিংস ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে কঠোর হস্তে দমনের নেপথ্যে প্রধান মাস্টারমাইন্ড বা পরিকল্পনাকারী ছিলেন সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক। আন্দোলন দমাতে সারা দেশে বিতর্কিত ‘কারফিউ’ (Curfew) জারি করা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া এবং সর্বোপরি নিরীহ ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে গায়েবি ও মিথ্যা মামলা সাজানোর মূল রূপকার ছিলেন এই দুজন। তাদের নির্দেশেই ঢাকাসহ সারা দেশে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে অসংখ্য তাজা প্রাণ কেড়ে নেওয়া হয়েছে বলে প্রসিকিউশন ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করেছে।


আইনজীবী ও ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, এই চাঞ্চল্যকর ও ঐতিহাসিক মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে মোট ২৮ জন সাক্ষীকে উপস্থাপন করা হবে। এই সাক্ষীদের তালিকায় রয়েছেন নিহতদের স্বজন, আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে পঙ্গুত্ববরণ করা ছাত্র-জনতা, প্রত্যক্ষদর্শী এবং বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞ।

আজ সাক্ষ্যগ্রহণের প্রথম দিনে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দেবেন জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ হওয়া এক অকুতোভয় আহত ‘জুলাই যোদ্ধা’। তার জবানবন্দির মধ্য দিয়ে জাতি জানতে পারবে কীভাবে সেদিন রাজপথে নিরস্ত্র ছাত্র-জনতার ওপর বৃষ্টির মতো গুলি বর্ষণ করা হয়েছিল এবং কীভাবে রাষ্ট্রযন্ত্র তার নাগরিকদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। একজন আহত যোদ্ধার সরাসরি সাক্ষ্যপ্রদান এই বিচারপ্রক্রিয়ায় একটি বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো সালমান এফ রহমান, আনিসুল হকসহ অন্যান্য অভিযুক্তদের ইতোমধ্যেই কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে।

শুধু জুলাই গণ-অভ্যুত্থানই নয়, বিগত সরকারের আমলে সংঘটিত আরও বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজও একই ট্রাইব্যুনালে সমান্তরালভাবে চলছে। আজ রোববার ট্রাইব্যুনালে রাজধানী ঢাকার কল্যাণপুরের ‘জাহাজ বাড়ি’ ট্র্যাজেডির একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার শুনানিও নির্ধারিত রয়েছে।

উল্লেখ্য, বিগত সরকারের শাসনামলে কল্যাণপুরের ওই ‘জাহাজ বাড়ি’তে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এক কথিত অভিযানে নয়জন তরুণকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। তৎকালীন পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে নিহতরা সবাই ভয়ংকর জঙ্গি। কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং স্বাধীন তদন্তে উঠে আসে যে, নিহত ওই নয়জন তরুণকে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে আটকে রেখে ‘জঙ্গি’ সাজিয়ে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এটি ছিল রাষ্ট্রীয় মদদে সংঘটিত একটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা ‘ফেক এনকাউন্টার’। আজ এই চাঞ্চল্যকর মামলার শুনানির মাধ্যমে কল্যাণপুর ট্র্যাজেডির প্রকৃত সত্য এবং এর পেছনের নির্দেশদাতাদের মুখোশ উন্মোচিত হবে বলে আশা করছেন ভুক্তভোগীদের স্বজনরা।


অন্যদিকে, বিগত সরকারের আরেক প্রভাবশালী মন্ত্রী এবং ১৪ দলীয় জোটের অন্যতম শীর্ষ নেতা হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান চলাকালে কুষ্টিয়ায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ছয়জন নিরীহ মানুষকে হত্যার দায়ে তাকে প্রধান অভিযুক্ত করা হয়েছে।

আজকের বিচারিক কার্যক্রমে কুষ্টিয়ায় সংঘটিত এই মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় হাসানুল হক ইনুর পক্ষে উপস্থাপন করা সাফাই সাক্ষীকে (Defense Witness) প্রসিকিউশনের আইনজীবীরা জেরা (Cross-examination) করবেন। এর আগে ইনুর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের সাক্ষীরা ট্রাইব্যুনালে তাদের রোমহর্ষক জবানবন্দি পেশ করেছেন। বিচারের স্বার্থে আজ হাসানুল হক ইনুকেও অন্যান্য আসামিদের সাথে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়েছে।


বাংলাদেশের বিচার বিভাগের ইতিহাসে বর্তমান আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম একটি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে যাচ্ছে। দেশের সাধারণ মানুষ, সুশীল সমাজ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে দীর্ঘদিনের ‘বিচারহীনতার সংস্কৃতি’র (Culture of Impunity) অবসান ঘটবে। বিগত স্বৈরাচারী সরকার তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য যেভাবে রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোকে ব্যবহার করে সাধারণ জনগণের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল, তার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

সাবেক মন্ত্রী আনিসুল হক, সালমান এফ রহমান কিংবা হাসানুল হক ইনুর মতো একসময়কার প্রবল প্রতাপশালী ব্যক্তিরা আজ যখন কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে নিজেদের কৃতকর্মের বিচারিক মুখোমুখি হচ্ছেন, তখন তা দেশের ভবিষ্যতের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা বহন করছে। বার্তাটি হলো—ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করলে একদিন না একদিন আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে। ইটিসি বাংলার নিজস্ব বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয় যে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার এবং আহত যোদ্ধারা গভীর আগ্রহ নিয়ে এই ট্রাইব্যুনালের দিকে তাকিয়ে আছেন। আজকের এই সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর মধ্য দিয়ে ন্যায়বিচারের যে পথ উন্মোচিত হলো, তা শেষ পর্যন্ত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে জাতির কলঙ্কমোচন করবে বলেই দেশবাসীর প্রত্যাশা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন