প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর প্রেসিডেন্ট জিয়ার পথেই হাঁটছেন তারেক রহমান: ফারুকীর নতুন রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বার্তা

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা এবং দেশের প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সবসময়ই সরব ও স্পষ্টভাষী। দেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে তিনি নিয়মিত নিজের সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরেন। সম্প্রতি তিনি বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছেন, যা মুহূর্তেই নেট দুনিয়ায় ভাইরাল হয়েছে এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানের রাজনৈতিক দর্শন ও সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে ফারুকী এই পোস্টটি করেন।


একুশে ফেব্রুয়ারি ও ভাষা আন্দোলনের পবিত্র মাস চলছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ভাষা শহীদদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে শহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে সেখানে মোনাজাত আদায় করেন। শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে একজন রাষ্ট্রপ্রধানের এই মোনাজাত আদায়ের দৃশ্যটি দেশের রাজনৈতিক মহলে নানা ধরনের আলোচনার জন্ম দেয়। অনেকেই বিষয়টিকে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করতে শুরু করেন। ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই মোস্তফা সরয়ার ফারুকী তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি দীর্ঘ স্ট্যাটাস দিয়ে বিষয়টি নিয়ে নিজের গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন।


ফারুকী তার স্ট্যাটাসে ১৯৫৩ সালের একটি ঐতিহাসিক ছবির কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, বেশ কিছুদিন আগে একজন তাকে একটি ছবি পাঠিয়েছিলেন। ছবিটি ছিল ১৯৫৩ সালে ভাষা শহীদদের স্মরণে আয়োজিত প্রথম দিককার প্রভাত ফেরি শেষে উপস্থিত মানুষের মোনাজাতরত অবস্থার একটি দুর্লভ দৃশ্য।

পাঠকদের সুবিধার জন্য ইটিসি বাংলার পক্ষ থেকে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ফেসবুক স্ট্যাটাসটি নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো:
“বেশ কিছুদিন আগে একজন আমাকে একটা ছবি পাঠায়। ছবিটার অথেনটিসিটি যাচাই করার জন্য একজনকে দেই। ছবিটা ছিল ১৯৫৩ সালে প্রভাত ফেরি শেষে মোনাজাতরত মানুষের। এর মধ্যে আজকে ফাহাম আব্দুস সালামের সৌজন্যে ওই ছবিটা টীকাসহ পাইলাম। আর গতকাল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শহীদ মিনারে মোনাজাত আদায় করলেন। অনেক দিন ধরে শুনতেছিলাম, তারেক রহমান এখন আর জিয়াউর রহমানের লাইনে নাই। আমি তো দেখলাম, প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর উনি পরিষ্কার প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পথেই হাঁটছেন।”


তারেক রহমানের বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থান ও দর্শন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাধারণ মানুষের মাঝে নানা ধরনের জল্পনা-কল্পনা ছিল। অনেকেই মনে করতেন, তারেক রহমান হয়তো তার পিতা এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মূল রাজনৈতিক ধারা থেকে কিছুটা সরে এসেছেন। কিন্তু মোস্তফা সরয়ার ফারুকী তার পর্যবেক্ষণে সম্পূর্ণ ভিন্ন মত পোষণ করেছেন।

জিয়াউর রহমানের সেই পথটি আসলে কী—সে বিষয়ে ফারুকী তার স্ট্যাটাসে চমৎকার বিশ্লেষণ দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “জিয়াউর রহমানের পথটা কী? সেটা হইলো আমাদের ধর্মীয় পরিচয়-আচার-রীতি না লুকাইয়াই আমরা একটা বহু জাতি-বহু ধর্ম-বহু ভাষার মানুষের রিপাবলিক বানাইতে পারি। যেই রিপাবলিকের মানুষ শহীদ মিনারে ফুল দেয়, চাইলে মোনাজাত পড়তে পারে, আবার গাইতেও পারে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো….’, যেই রিপাবলিক কারো হেজেমনিক পারপাস সার্ভ না কইরা আত্মপরিচয় গইড়া তুলতে পারে, যেই রিপাবলিকের মানুষেরা তার স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়া গৌরব করে এবং স্বাধীনতা রক্ষার প্রয়োজন হইলে চব্বিশ ঘটাইয়া দিতে পারে।”


ফারুকী তার এই লেখার মাধ্যমে একটি বহুত্ববাদী রিপাবলিক বা প্রজাতন্ত্রের সুনির্দিষ্ট চিত্র এঁকেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, নিজের ধর্মীয় পরিচয় এবং সংস্কৃতিকে গোপন বা অবদমিত না করেই একটি আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব। এটি এমন একটি রাষ্ট্র হবে, যেখানকার মানুষেরা শহীদ মিনারে গিয়ে পরম শ্রদ্ধায় ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের স্মরণ করবে, সমস্বরে গাইবে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’, আবার একই সাথে চাইলে সেখানে দাঁড়িয়ে পরম করুণাময়ের কাছে মোনাজাতও করতে পারবে। এই রাষ্ট্রটি অন্য কোনো পরাশক্তির ‘হেজেমনিক পারপাস’ বা আধিপত্যবাদী উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য কাজ করবে না; বরং নিজেদের শেকড় এবং সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন আত্মপরিচয় গড়ে তুলবে।

একইসঙ্গে ফারুকী দেশের স্বাধীনতা এবং ২০২৪ সালের ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গও সুকৌশলে তুলে এনেছেন। তার মতে, দেশপ্রেমিক এই মানুষেরা নিজেদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যেমন অহংকার করে, তেমনি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়লে তারা আবারও ‘চব্বিশ’-এর মতো গণবিপ্লব ঘটিয়ে দিতে প্রস্তুত।


স্ট্যাটাসের শেষ অংশে ফারুকী একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চিন্তার উদ্রেককারী প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, “কিন্তু এখন প্রশ্ন হইলো- কে বা কারা কোন সংকোচে এই মোনাজাতকে আমাদের কালেকটিভ মেমোরি থেকে মুছে দিতে চাইলো? এর পেছনের রাজনীতিটাই বাংলাদেশের অনেকগুলা সাংস্কৃতিক সংকটের একটা।”

এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি মূলত বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক রাজনীতির একটি বড় সংকটের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। ফারুকী মনে করেন, ১৯৫৩ সালে প্রভাত ফেরিতে মোনাজাতের যে রীতি ছিল, পরবর্তী সময়ে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক ধারা সুকৌশলে সেটিকে বাঙালির সাংস্কৃতিক ইতিহাস বা ‘যৌথ স্মৃতি’ থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বাঙালি সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় মূল্যবোধের মধ্যে একটি কৃত্রিম বিভাজন তৈরি করে রাখা হয়েছিল। শহীদ মিনার বা স্মৃতিসৌধের মতো জাতীয় স্থানগুলোতে ধর্মীয় রীতিনীতি পালন নিয়ে একটি অঘোষিত সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব বিরাজমান ছিল। ফারুকী তার স্ট্যাটাসের মাধ্যমে এই দ্বন্দ্বের মূলেই আঘাত করেছেন।


রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ফারুকীর এই স্ট্যাটাসটি অত্যন্ত সময়োপযোগী। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর তারেক রহমানের এই ধরনের অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপগুলো দেশের সাধারণ মানুষের মাঝেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তিনি একদিকে যেমন আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামো বিনির্মাণের কথা বলছেন, অন্যদিকে দেশীয় সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন। মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর এই মূল্যায়ন প্রমাণ করে যে, দেশের সচেতন নাগরিক সমাজও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই রাজনৈতিক দর্শনের দিকে সতর্ক নজর রাখছেন। এই স্ট্যাটাসটি শুধু একজন নেতার রাজনৈতিক কৌশলের বিশ্লেষণই নয়, বরং এটি একটি জাতির হারানো সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় পুনর্গঠনেরও একটি জোরালো বার্তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন