বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে ফের উত্তাপ ছড়াচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যখন ইরানের চরম উত্তেজনা বিরাজ করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে নিজেদের সামরিক সক্ষমতার এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করল তেহরান। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নৌবাহিনী অত্যন্ত সফলভাবে তাদের অত্যাধুনিক ‘সায়াদ-৩জি’ (Sayyad-3G) আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা সম্পন্ন করেছে। কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালিতে এই ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালানো হয়। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সামরিক উপস্থিতির
গত ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালি অঞ্চলে শুরু হয়েছিল তিন দিনব্যাপী বিশেষ সামরিক মহড়া, যার সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছিল ‘স্মার্ট কন্ট্রোল’ (Smart Control)। অত্যন্ত গোপনীয়তা ও নিখুঁত পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে পরিচালিত এই মহড়াটি সম্প্রতি সফলভাবে শেষ হয়েছে। এই মহড়া চলাকালীন সময়েই আইআরজিসি (IRGC)-এর নৌবাহিনী প্রথমবারের মতো তাদের এই নৌ-ভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পরীক্ষা করে। শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির প্রকাশিত এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, আইআরজিসি নৌবাহিনী শনিবার ‘শহীদ সায়াদ শিরাজি’ (Shahid Sayyad Shirazi) নামক রণতরী থেকে ভূমিভিত্তিক সায়াদ-৩জি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার নৌ সংস্করণ উৎক্ষেপণের একটি চমকপ্রদ ভিডিও প্রকাশ করেছে। এই ভিডিওতে দেখা যায়, ক্ষেপণাস্ত্রটি অত্যন্ত দ্রুতগতিতে তার লক্ষ্যবস্তুর দিকে ধেয়ে যাচ্ছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্রটি আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে গেম-চেঞ্জার হতে পারে। সায়াদ-৩জি ক্ষেপণাস্ত্রটি উল্লম্বভাবে (Vertical Launch) উৎক্ষেপণ ক্ষমতা সম্পন্ন, যার ফলে এটি অত্যন্ত দ্রুত যেকোনো দিক থেকে আসা আক্রমণ প্রতিহত করতে পারে। এর পাল্লা বা রেঞ্জ হচ্ছে ১৫০ কিলোমিটার (প্রায় ৯৩ মাইল)। ইরানি সামরিক কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, এই অত্যাধুনিক ব্যবস্থাটি মূলত ‘শহীদ সোলেইমানি’ (Shahid Soleimani) ক্লাসের সামরিক জাহাজগুলোর জন্য তৈরি করা হয়েছে। এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থার মাধ্যমে ওই জাহাজগুলো তাদের চারপাশে একটি শক্তিশালী এবং অভেদ্য আঞ্চলিক বিমান প্রতিরক্ষা বলয় বা সুরক্ষা শিল্ড স্থাপন করতে সক্ষম হবে।
ইরান হঠাৎ করেই এই প্রযুক্তি অর্জন করেনি; বরং এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ গবেষণার ইতিহাস। এর আগে ২০১৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর ইরান প্রথমবারের মতো দূরপাল্লার ভূমিভিত্তিক ‘সায়াদ-৩’ (Sayyad-3) বিমান প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালিয়েছিল। সেই ভূমিভিত্তিক সংস্করণটির পাল্লা ছিল ১২০ কিলোমিটার, এর দৈর্ঘ্য ৬ মিটার এবং ওজন প্রায় ৯০০ কেজি। বিগত কয়েক বছরে ইরানি বিজ্ঞানীরা সেই প্রযুক্তির আরও আধুনিকায়ন করে এর নৌ-সংস্করণ তৈরি করেছেন, যার পাল্লা আগের চেয়ে ৩০ কিলোমিটার বেশি এবং এটি সমুদ্রের প্রতিকূল পরিবেশেও নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।
হরমুজ প্রণালিতে এই পরীক্ষা চালানোর বিষয়টি মোটেও কাকতালীয় নয়। বিশ্বব্যাপী সামুদ্রিক তেল বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এই অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ যার হাতে থাকে, বৈশ্বিক অর্থনীতিতে তার প্রভাব তত বেশি। ইরান বরাবরই হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের সামরিক আধিপত্য বজায় রাখতে সচেষ্ট। নতুন এই আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পরীক্ষা প্রমাণ করে যে, পারস্য উপসাগরে যেকোনো বিদেশি শক্তির আকাশপথে আক্রমণ প্রতিহত করতে ইরান এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুত।
বর্তমান সময়ে ইরানের এই সামরিক মহড়া ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার নেপথ্যে সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নানামুখী চাপ। পারমাণবিক চুক্তি (Nuclear Deal) ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক এখন সম্পূর্ণ তলানিতে এসে ঠেকেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের ইউরোপীয় মিত্রদের গভীর সন্দেহ— ইরান গোপনে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে অগ্রসর হচ্ছে। যদিও ইরান শুরু থেকেই এই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে আসছে এবং তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করছে।
এদিকে, এই উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষ করে ইরানের কাছাকাছি অঞ্চলে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করছে। বর্তমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে প্রকাশ্যে জানিয়েছেন যে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তিনি ইরানের ওপর সীমিত আকারের সামরিক হামলার (Limited Military Strike) কথা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছেন। ওয়াশিংটনের এই মারমুখী অবস্থান পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে একটি সম্ভাব্য যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রের এমন প্রকাশ্য হুমকির মুখে ইরান যে কোনোভাবেই পিছু হটবে না, তা পরিষ্কার করে দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। ওয়াশিংটনের তরফ থেকে আসা লাগাতার কূটনৈতিক চাপ এবং সামরিক তৎপরতার মুখে তেহরান বিন্দুমাত্র মাথা নত করবে না বলে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা দিয়েছেন।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারিত এক বিশেষ ভাষণে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান দেশের জনগণের উদ্দেশ্যে বলেন, “বিশ্বশক্তিগুলো আজ আমাদের মাথা নত করাতে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। তারা আমাদের অর্থনীতি, সামরিক বাহিনী এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর নানামুখী অবরোধ ও চাপ সৃষ্টি করছে। কিন্তু তারা আমাদের জন্য যত বড় বাধাই বা সমস্যাই সৃষ্টি করুক না কেন, আমরা কোনো অবস্থাতেই তাদের কাছে মাথা নত করব না। ইরানের জনগণ স্বাধীন ও সার্বভৌম, এবং আমরা আমাদের আত্মরক্ষা ও মাতৃভূমির সুরক্ষায় যেকোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত।”
সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালিতে সায়াদ-৩জি ক্ষেপণাস্ত্রের এই সফল পরীক্ষা শুধুমাত্র একটি সামরিক মহড়া নয়; বরং এটি পশ্চিমা বিশ্বের প্রতি ইরানের একটি সুস্পষ্ট হুংকার। “ইটিসি বাংলা”র বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয় যে, আমেরিকা ও ইরানের মধ্যকার এই স্নায়ুযুদ্ধ খুব শিগগিরই থামার কোনো লক্ষণ নেই। পারমাণবিক ইস্যু এবং সামরিক মহড়াকে কেন্দ্র করে পারস্য উপসাগরে যেকোনো সময় এক অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘাতের সূত্রপাত হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে গোটা বিশ্বের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে।
