বিশ্ববাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে এক অভাবনীয় এবং নাটকীয় মোড় উপস্থিত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর নজিরবিহীনভাবে আরোপিত বিতর্কিত ‘পাল্টা শুল্ক’ বা রেসিপ্রোকাল ট্যারিফকে সম্পূর্ণ অবৈধ ও এখতিয়ারবহির্ভূত বলে ঐতিহাসিক রায় দিয়েছেন দেশটির সুপ্রিম কোর্ট। তবে সর্বোচ্চ আদালতের এই রায়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প পিছু হটেননি; বরং চরম ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বিশ্বের সকল দেশের ওপর নতুন করে ১০ শতাংশ হারে সার্বজনীন শুল্ক আরোপের পাল্টা হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। এই পাল্টাপাল্টি আইনি ও প্রশাসনিক লড়াইয়ের ফলে বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর রপ্তানি খাত চরম অনিশ্চয়তা ও গভীর দুশ্চিন্তার মুখে পড়েছে।
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এক যুগান্তকারী ও ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুল্ক নীতির লাগাম টেনে ধরেন। আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল ইমারজেন্সি ইকোনমিক পাওয়ারস অ্যাক্ট (আইইইপিএ- IEEPA) ব্যবহার করে যে একতরফা শুল্ক আরোপ করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে বা ওই আইনে প্রেসিডেন্টকে এমন একচ্ছত্র ও স্বেচ্ছাচারী ক্ষমতা প্রদান করা হয়নি।
আদালতের ৯ জন বিচারপতির সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে দীর্ঘ শুনানি শেষে ৬-৩ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে এই শুল্ক ব্যবস্থার বিপক্ষে রায় প্রদান করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে গত বছরের (২০২৫ সালের) ২ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর কার্যকর হওয়া অতিরিক্ত ও বৈষম্যমূলক শুল্ক ব্যবস্থাটি তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল বলে গণ্য হলো। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষকরা সুপ্রিম কোর্টের এই রায়কে বিশ্ববাণিজ্যের জন্য একটি বিশাল আইনি বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের এই রায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এক বড় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চপেটাঘাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। রায়ের পরপরই চরম ক্ষুব্ধ ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে তড়িঘড়ি করে এক বিশেষ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেন। সেখানে তিনি চিরাচরিত আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে আদালতের রায়ের তীব্র সমালোচনা করেন।
আদালতের এই রায়কে ‘জাতির জন্য এক চরম অসম্মানজনক ঘটনা’ বলে অভিহিত করে ট্রাম্প অভিযোগ করেন যে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা মার্কিন জনগণের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে ‘বিদেশিদের স্বার্থ রক্ষা’ করার কাজে লিপ্ত হয়েছেন। তিনি আরও ঘোষণা করেন যে, একটি আইনি পথ বন্ধ হয়ে গেলেও তিনি বিকল্প আইনি ক্ষমতা প্রয়োগ করবেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্ট আইইইপিএ (IEEPA) আইনের ব্যবহার বাতিল করলেও, তিনি ১৯৭৪ সালের মার্কিন বাণিজ্য আইন (Trade Act of 1974) এবং ১৯৬২ সালের বাণিজ্য সম্প্রসারণ আইন (Trade Expansion Act of 1962) ব্যবহার করে বিশ্বের সকল দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে এবং আরও কঠোরভাবে ১০ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপের পথে হাঁটবেন।
মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের এই রায় এবং ট্রাম্পের নতুন ঘোষণার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত, বিশেষ করে তৈরি পোশাক ও অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্প। গত বছর দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই ট্রাম্প তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির আওতায় মার্কিন বাণিজ্যিক অংশীদারদের ওপর নজিরবিহীন মাত্রায় শুল্কারোপ শুরু করেন।
শুরুর দিকে বাংলাদেশের জন্য এই নীতি এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছিল। সে সময় বাংলাদেশি পণ্যের ওপর রেকর্ড ৩৭ শতাংশ পাল্টা শুল্ক বা রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ আরোপ করা হয়েছিল, যা দেশের রপ্তানিকারকদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার উপক্রম করেছিল। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা এবং দীর্ঘ ও জটিল দরকষাকষির পর চলতি মাসের (ফেব্রুয়ারি ২০২৬) শুরুতেই হওয়া এক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে এই অতিরিক্ত শুল্কের হার ৩৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল।
কিন্তু আদালতের নতুন এই আদেশের ফলে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানিতে শুল্কের হিসেবে এক বিশাল ও জটিল পরিবর্তনের সৃষ্টি হতে যাচ্ছে। ইটিসি বাংলার অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী, পূর্বে বিদ্যমান ১৫ শতাংশ নিয়মিত শুল্কের সঙ্গে ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্ক মিলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পণ্য প্রবেশের ক্ষেত্রে মোট শুল্কের হার দাঁড়িয়েছিল ৩৪ শতাংশে। শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ফলে ওই ১৯ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আইনগতভাবে বাতিল হয়ে গেছে, যা প্রাথমিকভাবে বাংলাদেশের জন্য একটি বড় স্বস্তির খবর হতে পারত। কিন্তু ট্রাম্পের নতুন ঘোষিত ১০ শতাংশ শুল্ক যদি এর সঙ্গে যুক্ত হয়, তবে মোট শুল্কের হার কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে বা পূর্বের ১৫ শতাংশ নিয়মিত শুল্কের সঙ্গে এর কোনো সমন্বয় হবে কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকদের মধ্যে চরম অস্পষ্টতা ও ধোঁয়াশা বিরাজ করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ এই আইনি ও প্রশাসনিক লড়াই পুরো বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। তবে ট্রাম্প তার সংবাদ সম্মেলনে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ভারতের মতো কিছু কৌশলগত মিত্র দেশের সঙ্গে করা বিশেষ দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিগুলো হয়তো বহাল থাকতে পারে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অসম প্রতিযোগিতার সৃষ্টি হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মার্কিন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ইওয়াই-পার্থেনন’-এর প্রধান অর্থনীতিবিদ গ্রেগরি ডাকো বর্তমান পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে জানিয়েছেন, সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে গাণিতিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের গড় শুল্ক হার সাময়িকভাবে ১৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে কমে ৯ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এটি বিশ্ববাজারে স্বল্প সময়ের জন্য স্বস্তি নিয়ে এলেও, ট্রাম্পের নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণার প্রেক্ষিতে এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে বিশ্ববাণিজ্যে যে ‘শুল্ক কূটনীতি’ বা ট্যারিফ ডিপ্লোমেসি প্রয়োগ করে অস্থিরতা তৈরি করেছেন, তা নতুন এই ১০ শতাংশ সার্বজনীন শুল্ক ঘোষণার মাধ্যমে আরও ঘনীভূত ও জটিল হলো। আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই খেয়ালখুশিমতো শুল্ক নীতি পরিবর্তন বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এক অশনিসংকেত। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, ক্রয়াদেশ গ্রহণ এবং উৎপাদনশীলতা বজায় রাখার জন্য একটি স্থিতিশীল শুল্ক কাঠামোর প্রয়োজন। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের এই অপ্রত্যাশিত পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য ব্যবসা পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন করে তুলছে। সামনের দিনগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বাণিজ্য বিভাগ (ইউএসটিআর) কীভাবে এই নতুন ১০ শতাংশ শুল্ক বাস্তবায়ন করে এবং বাংলাদেশের কূটনীতি কীভাবে এই নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় দেখার বিষয়।
