বাংলাদেশের সড়ক, রেল ও নৌপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি দীর্ঘদিনের একটি বহুল আলোচিত, সমালোচিত ও সাধারণ মানুষের জন্য চরম ভোগান্তির বিষয়। পরিবহন খাতে এই অবৈধ অর্থ আদায়ের কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধিসহ সাধারণ যাত্রীদের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম হয়। এহেন পরিস্থিতিতে সম্প্রতি সড়কপরিবহন, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম পরিবহন খাতে সংঘটিত চাঁদাবাজিকে কার্যত ‘সমঝোতা’ হিসেবে আখ্যায়িত করে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। মন্ত্রীর এই বিতর্কিত মন্তব্যের মাধ্যমে চাঁদাবাজিকে পরোক্ষভাবে ‘বৈধতা’ দেওয়া হয়েছে—এমন গুরুতর অভিযোগ তুলে এর তীব্র নিন্দা, কঠোর প্রতিবাদ এবং গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের পবিত্র দিনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের গণমাধ্যমে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক ও বিস্তারিত বিবৃতির মাধ্যমে দলটির এই কঠোর অবস্থানের কথা দেশবাসীর সামনে তুলে ধরেন।
সড়ক ও পরিবহন খাত বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। কিন্তু এই খাতে দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে বেপরোয়া চাঁদাবাজি চলার অভিযোগ রয়েছে। পরিবহন মালিক, শ্রমিক সংগঠন এবং কতিপয় অসাধু রাজনৈতিক প্রভাবশালীর যোগসাজশে চলা এই চাঁদাবাজিকে যখন স্বয়ং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ‘সমঝোতা’ বা মিউচুয়াল আন্ডারস্ট্যান্ডিং বলে অভিহিত করেন, তখন তা সচেতন মহলকে গভীরভাবে হতবাক করেছে।
এই প্রেক্ষিতে জামায়াতে ইসলামীর প্রচার বিভাগের প্রধান অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের তার বিবৃতিতে বলেন, “সম্প্রতি সড়কপরিবহন, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম অত্যন্ত দায়িত্বহীনভাবে ‘সমঝোতার’ নামে পরিবহন খাতের চাঁদাবাজিকে কার্যত বৈধতা দিয়েছেন। একজন মন্ত্রীর মুখ থেকে এমন বক্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আমি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে তার এই অনাকাঙ্ক্ষিত, অনভিপ্রেত ও সম্পূর্ণ অনৈতিক বক্তব্যের তীব্র নিন্দা ও কঠোর প্রতিবাদ জানাচ্ছি এবং একই সঙ্গে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি।”
চাঁদাবাজিকে নিছক কোনো সাধারণ অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলে মনে করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির মতে, এটি সরাসরি রাষ্ট্রের প্রচলিত আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অ্যাডভোকেট জুবায়ের বিষয়টির আইনি ও অর্থনৈতিক দিক বিশ্লেষণ করে বলেন, ‘চাঁদাবাজি একটি গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ। এটি কোনো অবস্থাতেই সাধারণ সমঝোতার বিষয় হতে পারে না। এই অপরাধটি আমাদের সমাজব্যবস্থা, জাতীয় অর্থনীতি এবং সর্বোপরি দেশে আইনের শাসনের জন্য এক মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রী, যিনি নিজেই সংবিধান ও আইন রক্ষার শপথ নিয়েছেন, তার বক্তব্যে যদি জনসমক্ষে এমন কোনো নেতিবাচক বার্তা যায় যে—অবৈধ অর্থ আদায় বা পেশিশক্তি ব্যবহার করে অনৈতিক সমঝোতা করাটা গ্রহণযোগ্য—তবে তা সমগ্র রাষ্ট্রের জন্য এক বিশাল কলঙ্ক।’
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয় যে, রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে এ ধরনের ‘বৈধতা’ দান করার প্রবণতা প্রকৃত অপরাধীদের চাঁদাবাজির মতো আরও অনেক জঘন্য অপরাধ করতে বেপরোয়াভাবে উৎসাহিত করবে। এর ফলে রাষ্ট্রের সামগ্রিক আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আর আইন-শৃঙ্খলা ভেঙে পড়লে দেশের সাধারণ জনগণ ন্যায়বিচার, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও সরকারের জবাবদিহিতা থেকে সম্পূর্ণরূপে বঞ্চিত হবে, যা একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
যেকোনো ধরনের দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে সরকারের নীতিগত অবস্থান কী হওয়া উচিত, সে বিষয়েও জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা ও দাবি তুলে ধরা হয়েছে। মিডিয়া বিভাগের প্রধান জুবায়ের অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, “আমরা দৃঢ়ভাবে মনে করি, একটি নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকারের প্রধান ও পবিত্র দায়িত্ব হলো দেশের সর্বত্র চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি গ্রহণ করা এবং এর সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান, দৃষ্টান্তমূলক ও কার্যকর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কোনো অবস্থাতেই ভয়ংকর অপরাধকে ‘সমঝোতার’ সুন্দর মোড়কে আড়াল করার কোনো সুযোগ বা এখতিয়ার কারও নেই।”
তিনি আরও যোগ করেন, “মাননীয় সড়কপরিবহন, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রীর এই অপ্রত্যাশিত বক্তব্য প্রমাণ করে যে, সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে ব্যর্থ হচ্ছে। শুধু তাই নয়, মন্ত্রীর এই বক্তব্য রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থানকে জনমানসে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।”
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিষয়ে তারা কোনো ধরনের আপস করতে রাজী নয়। অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে আমরা দেশের আপামর জনসাধারণকে স্পষ্টভাবে জানাতে চাই যে—চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও যেকোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়মের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান একেবারেই আপসহীন। আমরা সরকারের প্রতি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলতে চাই, দুর্নীতির সামান্য ছিটে-ফোঁটাও এ দেশের সচেতন দেশবাসী আর কোনোভাবেই বরদাস্ত করবে না।’
এই সংকট নিরসনে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সরাসরি সরকারের কাছে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট দাবি উত্থাপন করা হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমরা অবিলম্বে সরকারের নিকট জোর দাবি জানাই, সড়কপরিবহণ, রেল ও নৌপরিবহণ মন্ত্রী শেখ রবিউল আলমকে তার উক্ত বেআইনি ও জনস্বার্থবিরোধী বক্তব্য অনতিবিলম্বে প্রত্যাহার করতে হবে। শুধু প্রত্যাহারই নয়, দেশবাসীর নিকট এই মন্তব্যের সুস্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা প্রদান করতে হবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের বিভ্রান্তিকর ও অপরাধীদের উৎসাহদায়ক বক্তব্য প্রদান থেকে তাকে বিরত থাকতে হবে। একই সঙ্গে পরিবহন খাতসহ দেশের সব সেক্টরে চাঁদাবাজি প্রতিরোধে সরকারকে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ ও তার শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।’
সরকার যদি সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়, তবে বিরোধী দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামী নিষ্ক্রিয় বসে থাকবে না বলে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। অ্যাডভোকেট জুবায়ের বলেন, ‘অবিলম্বে সারা দেশে সব ধরনের চাঁদাবাজি বন্ধ করে জনগণের জানমাল ও সম্পদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আমরা সরকারের নিকট জোর দাবি জানাচ্ছি। নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তা দেওয়া কোনো দয়া নয়, বরং এটা যেকোনো সরকারের প্রধান ও মৌলিক সাংবিধানিক দায়িত্ব। এই পবিত্র দায়িত্ব পালনে বর্তমান সরকার যদি ব্যর্থ হয়, তবে দেশবাসীকে সঙ্গে নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ও মহল্লায় মহল্লায় চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে এক দুর্বার ও ঐক্যবদ্ধ গণ-প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে এবং যেকোনো মূল্যে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে সরকারকে বাধ্য করা হবে।’
সবশেষে তিনি দেশবাসীর প্রতি এক বিশেষ আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমরা দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণকে ন্যায়বিচার, সুশাসন এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ন্যায্য দাবিতে সবসময় সচেতন, সোচ্চার ও ঐক্যবদ্ধ থাকার উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি। জনগণের সম্মিলিত শক্তিই পারে সমাজ থেকে এই চাঁদাবাজির বিষবৃক্ষ সমূলে উৎপাটন করতে।’
পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি নীরব ঘাতক। পণ্যবাহী ট্রাক, কাভার্ডভ্যান কিংবা যাত্রীবাহী বাস—সব জায়গাতেই এই অবৈধ চাঁদার প্রভাব গিয়ে পড়ে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর। কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পায় না, অথচ বাজারে সেই একই পণ্য কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হয়, যার মূল কারণ এই পথে পথে চাঁদাবাজি। এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর ‘সমঝোতা’ বিষয়ক মন্তব্য স্বাভাবিকভাবেই জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। জামায়াতে ইসলামীর আজকের এই তীব্র প্রতিবাদ ও বিবৃতি সেই জনক্ষোভেরই একটি রাজনৈতিক বহিঃপ্রকাশ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের উচিত অবিলম্বে এই বিভ্রান্তি দূর করে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে তাদের কঠোর অবস্থান দেশবাসীর সামনে দৃশ্যমান করা। অন্যথায় বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে ভবিষ্যতে বৃহত্তর কোনো সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ দেওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
