ভালোবাসা দিবসের আনন্দঘন মুহূর্ত যখন চারদিকে বিরাজমান, ঠিক তখনই বিনোদন জগতে নেমে এসেছিল বিষাদের ছায়া। ছোট পর্দার জনপ্রিয় ও হাস্যোজ্জ্বল মুখ তানিয়া বৃষ্টির আকস্মিক অসুস্থতার খবরে স্তব্ধ হয়ে পড়েছিল তাঁর ভক্তকুল ও সহকর্মীরা। তবে অবশেষে সেই উৎকণ্ঠার কিছুটা অবসান ঘটেছে। রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে অভিনেত্রী তানিয়া বৃষ্টির জটিল ব্রেন টিউমার অস্ত্রোপচার।
রোববার (১৫ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে দীর্ঘ চার ঘণ্টার এক ম্যারাথন অস্ত্রোপচার শেষে চিকিৎসকরা টিউমারটি অপসারণ করতে সক্ষম হয়েছেন। বর্তমানে এই অভিনেত্রী পোস্ট-অপারেটিভ কেয়ার ইউনিটে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। চিকিৎসকরা অস্ত্রোপচার সফল বললেও আগামী ২৪ ঘণ্টা না পেরোনো পর্যন্ত তাঁকে পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত ঘোষণা করতে নারাজ।
পারিবারিক ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গতকাল রোববার দুপুরের পর তানিয়া বৃষ্টিকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়। স্নায়ুশল্যবিদদের (নিউরোসার্জন) একটি অভিজ্ঞ চিকিৎসক দল দীর্ঘ চার ঘণ্টা ধরে এই জটিল অস্ত্রোপচার পরিচালনা করেন।
চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, অস্ত্রোপচার চলাকালীন বড় কোনো জটিলতা বা ‘কমপ্লিকেশন’ দেখা দেয়নি। টিউমারটি সফলভাবেই অপসারণ করা সম্ভব হয়েছে। তবে মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচার সবসময়ই অত্যন্ত সংবেদনশীল। তাই তাঁকে এখন পোস্ট-অপারেটিভ কেয়ারে (নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র) রাখা হয়েছে। তাঁর জ্ঞান ফিরেছে কি না বা তিনি সাড়া দিচ্ছেন কি না, সে বিষয়ে চিকিৎসকরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন।
নির্মাতা হাসান রেজাউল, যিনি তানিয়ার চিকিৎসার সার্বিক খোঁজখবর রাখছেন, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি আপডেট দিয়েছেন। তিনি জানান, ‘‘আলহামদুলিল্লাহ, অপারেশন সাকসেসফুল। তবে ব্রেন সার্জারির পর পোস্ট-অপারেটিভ কিছু জটিলতা থাকার সম্ভাবনা থাকে। তাই এখনই তাঁকে পুরোপুরি বিপদমুক্ত বলা যাচ্ছে না। চিকিৎসকরা আগামী ২৪ ঘণ্টা তাঁকে কড়া পর্যবেক্ষণে রাখবেন।’’
তানিয়া বৃষ্টির অসুস্থতার বিষয়টি অনেকেই জানতেন না। তিনি নিজেও বিষয়টি নিয়ে খুব একটা সরব ছিলেন না। কিন্তু গত ১৪ ফেব্রুয়ারি, বিশ্ব ভালোবাসা দিবসে যখন সবাই প্রিয়জনকে নিয়ে আনন্দে মেতেছিলেন, তখন তানিয়া তাঁর ফেসবুকে একটি হৃদয়বিদারক স্ট্যাটাস দেন।
তিনি ছোট করে লিখেছিলেন, ‘‘কাল আমার মাথায় অস্ত্রোপচার, দোয়া করবেন সবাই। ব্রেন টিউমার।’’ এই দুটি শব্দ—‘ব্রেন টিউমার’—মুহূর্তের মধ্যেই শোবিজ অঙ্গনে আতঙ্কের সৃষ্টি করে। প্রাণচঞ্চল এই অভিনেত্রীর এমন মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার খবর কেউ বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। এর আগে তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ থেকে একটি পোস্টে অনুরোধ করা হয়েছিল, শুটিং বা কাজসংক্রান্ত বিষয়ে যেন কেউ তাঁকে ফোন বা মেসেজ না দেন। তখনই অনেকে আঁচ করেছিলেন, হয়তো বড় কোনো সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
জনপ্রিয় পরিচালক সকাল আহমেদ সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তানিয়া বৃষ্টি বেশ কিছুদিন ধরেই তীব্র মাথাব্যথা এবং শারীরিক অস্বস্তিতে ভুগছিলেন। শুরুতে হয়তো সাধারণ মাথাব্যথা মনে করে গুরুত্ব দেননি, কিন্তু ধীরে ধীরে অবস্থার অবনতি হতে থাকে।
সকাল আহমেদ বলেন, ‘‘শুটিং সেটে বা কাজের ফাঁকে প্রায়ই তানিয়া মাথাব্যথার কথা বলত। কিন্তু সে এতটাই কাজপাগল যে অসুস্থতা নিয়েও শুটিং চালিয়ে গেছে। সম্প্রতি ব্যথা অসহনীয় হয়ে উঠলে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং বিভিন্ন পরীক্ষার পর ব্রেন টিউমার ধরা পড়ে। চিকিৎসকরা কালবিলম্ব না করে দ্রুত অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন।’’
তানিয়া বৃষ্টির এই দুঃসময়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছে পুরো বিনোদন জগত। তাঁর অসুস্থতার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে ফেসবুকে সহকর্মী, নির্মাতা ও কলাকুশলীরা তাঁর সুস্থতা কামনা করে পোস্ট দিচ্ছেন।
জনপ্রিয় অভিনেত্রী সামিরা খান মাহি ফেসবুকে তানিয়ার সঙ্গে তোলা একটি হাস্যোজ্জ্বল ছবি শেয়ার করে আবেগঘন ক্যাপশনে লিখেছেন, ‘‘হাসপাতালের বিছানায় না, তোমাকে আবার হাসিমুখে আমাদের মাঝে দেখতে চাই। আল্লাহ তোমাকে দ্রুত সুস্থতা দান করুন।’’ তিনি সবার কাছে তানিয়ার জন্য দোয়া চেয়েছেন।
শুধু মাহি নন, নাট্যাঙ্গনের অনেক তারকা তানিয়ার সঙ্গে কাজের স্মৃতিচারণ করছেন। কেউ শেয়ার করছেন শুটিং সেটের ভিডিও, কেউবা পুরোনো ছবি। সবার বার্তায় একটাই সুর—‘ফিরে এসো তানিয়া, শুটিং ফ্লোর তোমাকে মিস করছে।’
নির্মাতা ও সহশিল্পীরা বলছেন, তানিয়া বৃষ্টি শুধু একজন ভালো অভিনেত্রীই নন, ব্যক্তি হিসেবেও তিনি অত্যন্ত অমায়িক। তাঁর এই অসুস্থতা মেনে নেওয়া কঠিন। তবে সবার বিশ্বাস, তিনি এই কঠিন লড়াইয়ে জিতে ফিরবেন।
তানিয়া বৃষ্টির পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনরা বর্তমানে হাসপাতালে ভিড় না করার জন্য সবার প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন। মস্তিষ্কের অস্ত্রোপচারের পর রোগীর পূর্ণ বিশ্রাম ও ইনফেকশনমুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন। তাই দর্শনার্থীদের প্রবেশে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।
ফেসবুকে দেওয়া এক বার্তায় বলা হয়েছে, ‘‘দয়া করে কেউ হাসপাতালে ভিড় করবেন না এবং ফোনে কল দিয়ে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করবেন না। এতে রোগীর চিকিৎসায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে। আপনারা শুধু দোয়া করবেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আমরাই আপডেট জানাব।’’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তানিয়া বৃষ্টির ভক্তরা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন। ইটিসি বাংলার ফেসবুক পেজেও হাজারো ভক্ত কমেন্ট বক্সে তাঁর সুস্থতা কামনা করেছেন। একজন ভক্ত লিখেছেন, ‘‘আপনার অভিনয় আমাদের মুগ্ধ করে। আল্লাহ আপনাকে দ্রুত সুস্থ করে আমাদের মাঝে ফিরিয়ে দিন।’’
২০২৬ সালের শুরুটা বিনোদন জগতের জন্য খুব একটা সুখকর হচ্ছে না। একের পর এক তারকার অসুস্থতার খবর মন খারাপ করে দিচ্ছে সাধারণ দর্শকদের। তবে তানিয়া বৃষ্টির সফল অস্ত্রোপচার ভক্তদের মনে আশার সঞ্চার করেছে।
বর্তমানে চিকিৎসকরা তাঁকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। পরবর্তী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা না দেয়, তবে তাঁকে কেবিনে স্থানান্তর করা হতে পারে। ইটিসি বাংলা তানিয়া বৃষ্টির শারীরিক অবস্থার প্রতি মুহূর্তের খবর পাঠকের কাছে পৌঁছে দেবে। আমরাও এই গুণী অভিনেত্রীর দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি।
