ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি ও প্লট নিচ্ছেন না জামায়াতের এমপিরা

বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের প্রচলিত ভিআইপি সংস্কৃতি বা বিলাসিতার প্রথা ভেঙে এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে দলটির নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রদত্ত শুল্কমুক্ত (ট্যাক্স ফ্রি) গাড়ি এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) সরকারি প্লট গ্রহণ করবেন না। নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই সিদ্ধান্তে অটল থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জামায়াত নেতা ও সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির।

আজ সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড পেজে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে শিশির মনির বিষয়টি পরিষ্কার করেন। এই ঘোষণা দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের এক নতুন বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অন্যতম ব্যক্তিত্ব মোহাম্মদ শিশির মনির তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী আমাদের এমপি মহোদয়গণ ট্যাক্স ফ্রি গাড়ি এবং সরকারি প্লট গ্রহণ করবেন না। ইনশাআল্লাহ।”

তাঁর এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ বার্তাটি মুহূর্তের মধ্যেই ভাইরাল হয়ে যায়। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা নেওয়া এবং গুলশান-বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় সরকারি প্লট বরাদ্দ পাওয়া একটি অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী তাদের ৬৮ জন সংসদ সদস্যের মাধ্যমে সেই প্রথাকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাখ্যান করল। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং কৃচ্ছ্রসাধন ও জনগণের অর্থের অপচয় রোধে একটি নৈতিক অবস্থান।

জামায়াতের এই সিদ্ধান্ত আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়। এর আগেও দলীয় ফোরামে এবং জনসমক্ষে দলটির শীর্ষ নেতারা এ বিষয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। বিশেষ করে গত বছরের ৭ নভেম্বর সিলেট মহানগরে আয়োজিত এক বিশাল সুধী সমাবেশে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্ট ভাষায় এই অঙ্গীকার করেছিলেন।

সেদিন ডা. শফিকুর রহমান বলেছিলেন, “আগামীতে আমাদের একজনও যদি এমপি নির্বাচিত হন, তাদের কেউ সরকারি প্লট নেবেন না ও বিনা ট্যাক্সের গাড়িতে চলবেন না। আমরা রাজনীতি করি মানুষের কল্যাণের জন্য, নিজেদের আখের গোছানোর জন্য নয়।”

আজ শিশির মনিরের ঘোষণার মাধ্যমে আমিরে জামায়াতের সেই বক্তব্যেরই আনুষ্ঠানিক প্রতিফলন ঘটল। দলের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় কেনা বিলাসদ্রব্য ভোগ না করে, তারা সাধারণ মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে সাধারণ জীবনযাপনই বেছে নিতে চান।

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সমমনা জোট। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২৯৯টি আসনে ভোট গ্রহণ হলেও এখন পর্যন্ত ২৯৭টি আসনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে জামায়াত জোট মোট ৭৭টি আসনে বিজয়ী হয়ে সংসদের অন্যতম প্রধান শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

দলের ইতিহাসে এবারই সর্বোচ্চ সংখ্যক আসন লাভ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এককভাবে তারা ৬৮টি আসনে জয়লাভ করেছে, যা দলটির রাজনৈতিক গ্রাফে এক বিশাল উল্লম্ফন। এর আগে কখনোই সংসদে তাদের এত বিশাল প্রতিনিধিত্ব ছিল না।

জামায়াতের এই বিজয়ের মিছিলে শরিক দলগুলোর ফলাফলও বেশ ঈর্ষণীয়। বিশেষ করে জুলাই আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে রাজপথে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের নিয়ে গঠিত ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ (এনসিপি) ৬টি আসনে জয়ী হয়েছে। তরুণ প্রজন্মের এই প্রতিনিধিরা সংসদে নতুন ধারার রাজনীতির প্রবর্তন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এনসিপির নির্বাচিতরাও জামায়াতের মতো কৃচ্ছ্রসাধনের নীতি অনুসরণ করবেন বলে দলীয় সূত্রে আভাস পাওয়া গেছে।

এছাড়া জোটের অন্য শরিকদের মধ্যে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২টি এবং খেলাফত মজলিস ১টি আসনে জয়লাভ করেছে। সব মিলিয়ে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও জাতীয়তাবাদী চেতনার এই জোট সংসদে একটি শক্তিশালী ব্লক তৈরি করেছে।

বাংলাদেশে সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধা একটি বহুল আলোচিত ও সমালোচিত বিষয়। সাধারণ মানুষকে যেখানে উচ্চ হারে শুল্ক দিয়ে গাড়ি কিনতে হয়, সেখানে জনপ্রতিনিধিদের জন্য কোটি কোটি টাকার শুল্ক মওকুফের সুবিধা নিয়ে জনমনে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ছিল। এছাড়া ঢাকার বুকে সরকারি প্লট বরাদ্দ নেওয়াকেও অনেকে ক্ষমতার অপব্যবহার হিসেবে দেখেন।

এমন প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামীর এই ‘না’ বলার সংস্কৃতি রাজনীতিতে গুণগত মান পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। বিশ্লেষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, জামায়াতের এই পদক্ষেপ অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর ওপরও এক ধরনের নৈতিক চাপ সৃষ্টি করবে। যদি তারা সত্যিই এই সুবিধা প্রত্যাখ্যান করেন, তবে তা হবে আগামীর বাংলাদেশের জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

সোশ্যাল মিডিয়ায় শিশির মনিরের পোস্টের নিচে সাধারণ মানুষের ব্যাপক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। নেটিজেনরা এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলছেন, জনপ্রতিনিধিরা যদি বিলাসিতা ত্যাগ করেন, তবে প্রশাসনের সর্বস্তরে দুর্নীতি ও অপচয় কমে আসবে।

আগামীকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। শপথের পর জামায়াতের এমপিরা তাদের এই অঙ্গীকার কীভাবে দাপ্তরিকভাবে কার্যকর করেন, সেদিকেই এখন সবার দৃষ্টি। তবে বর্তমান ঘোষণা অনুযায়ী, ত্রয়োদশ সংসদ যে গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে ভিন্ন এক রাজনৈতিক আবহে যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

১. সুবিধা প্রত্যাখ্যান: এমপিদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও সরকারি প্লট না নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত।
২. প্রতিশ্রুতির রক্ষা: দলীয় আমিরের আগের ঘোষণার বাস্তবায়ন।
৩. নির্বাচনী সাফল্য: জামায়াতের ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৬৮ আসনে জয় এবং জোটগতভাবে ৭৭ আসন লাভ।
4. তরুণ নেতৃত্ব: জুলাই আন্দোলনের ফসল এনসিপির ৬ আসন প্রাপ্তি।
৫. রাজনৈতিক প্রভাব: ভিআইপি কালচার বা বিলাসিতার বিরুদ্ধে নৈতিক অবস্থান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন