চুক্তিতে না পৌঁছালে ইরানে ভয়াবহ হামলার কড়া হুমকি ট্রাম্পের, চরম সামরিক উত্তেজনার মাঝেই ওয়াশিংটন ও তেহরান

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক আকাশে আবারও ঘনীভূত হচ্ছে যুদ্ধের কালো মেঘ। পারমাণবিক চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানে ভয়াবহ সামরিক হামলা চালানো হবে—যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন একটি চরম ও চূড়ান্ত হুমকির মধ্যেই বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তৃতীয় দফার পরোক্ষ আলোচনায় বসতে যাচ্ছেন মার্কিন ও ইরানি শীর্ষ কর্মকর্তারা। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা এই আলোচনাটিকে মধ্যপ্রাচ্যে একটি সর্বাত্মক ও ধ্বংসাত্মক সংঘাত রোধ করার ‘শেষ আইনি ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। তবে এই আলোচনার টেবিলে আদৌ কোনো সম্মানজনক চুক্তির সম্ভাবনা রয়েছে কি না, তা নিয়ে এখনও বিশ্বজুড়ে চরম অনিশ্চয়তা ও অস্পষ্টতা বিরাজ করছে।


সামরিক দিক থেকে পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন একটি বারুদের স্তূপে পরিণত হয়েছে। ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট বাহিনীর ইরাক আক্রমণের পর এই অঞ্চলে সব থেকে বড় ও ভয়ংকর সেনা সমাবেশ ঘটিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সুবিশাল সামরিক উপস্থিতিকে ‘আর্মাডা’ বা অপরাজেয় রণতরীর বহর হিসেবে বর্ণনা করেছেন। পেন্টাগন সূত্রে জানা গেছে, এই বিশাল সামরিক বহরে বর্তমানে দুটি অত্যাধুনিক বিমানবাহী রণতরী, অসংখ্য আক্রমণাত্মক যুদ্ধজাহাজ, স্টিলথ যুদ্ধবিমান এবং আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহকারী বিশেষায়িত বিমান প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে, ইরানও বসে নেই। তেহরান অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঙ্কার দিয়ে রেখেছে যে, তাদের ভূখণ্ডে বিন্দুমাত্র মার্কিন আগ্রাসন চালানো হলে এর দাঁতভাঙা জবাব দেওয়া হবে। মার্কিন সামরিক স্থাপনা এবং ইসরায়েলের গভীরে পাল্টা আঘাত হানার অঙ্গীকার করেছে দেশটির রেভোলিউশনারি গার্ড। এমন একটি শ্বাসরুদ্ধকর ও যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতির মাঝেই জেনেভায় কূটনীতির শেষ তাস খেলতে নামছে উভয় দেশ।


ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন যে, তিনি সামরিক সংঘাতের চেয়ে কূটনীতির মাধ্যমে সংকট সমাধান করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তবে তিনি এটিও স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ইরানের শীর্ষ নেতাদের একটি পশ্চিমা শর্তযুক্ত চুক্তি মেনে নিতে বাধ্য করার জন্য দেশটির ওপর সীমিত পরিসরে সামরিক হামলার কথা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে হোয়াইট হাউজ।

আট মাস আগে ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের সময় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আমেরিকা সরাসরি বোমা হামলা চালিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই সময় দাবি করেছিলেন যে, স্থাপনাগুলো পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন কেন নতুন করে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে এবং জেনেভার আলোচনায় আমেরিকা ঠিক কী দাবি করছে, সে বিষয়ে ট্রাম্প সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি। তবে ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন যে, গত বছরের ওই হামলার পর ইরান পুনরায় নতুন করে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি শুরু করার চেষ্টা চালাচ্ছে। তিনি অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ঘোষণা করেছেন যে, বিশ্ব সন্ত্রাসের ‘এক নম্বর পৃষ্ঠপোষককে’ তিনি কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্রের মালিক হওয়ার অনুমতি দিতে পারেন না।


চলতি মাসের শুরুতে ওমানের রাজধানী মাস্কাটের মধ্যস্থতায় আগের দুই দফা পরোক্ষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় জেনেভার এই তৃতীয় দফার বৈঠকেও ইরানের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করবেন বিশেষ মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অত্যন্ত আস্থাভাজন জামাতা জ্যারেড কুশনার।

জানা গেছে, ইরান তার নিজস্ব ভূখণ্ডে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ পুরোপুরি বন্ধ করার যে মার্কিন দাবি, তা অত্যন্ত কড়া ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে আন্তর্জাতিক মহলের ধারণা, তেহরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিতে কিছু ছাড় দিতে প্রস্তুত রয়েছে। জেনেভায় চলমান এই আলোচনায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের জন্য একটি ‘আঞ্চলিক কনসোর্টিয়াম’ গঠনের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে। এছাড়া ইরানের হাতে থাকা প্রায় ৪০০ কেজি (৮৮০ পাউন্ড) উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বিশাল মজুদ নিয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা এই আলোচনার অন্যতম প্রধান বিষয়বস্তু। এর বিনিময়ে ইরান চাইছে পশ্চিমা দেশগুলো যেন তাদের ওপর থেকে সেই সমস্ত কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেয়, যা বিগত বছরগুলোতে ইরানের অর্থনীতিকে আক্ষরিক অর্থেই পঙ্গু করে দিয়েছে।


ট্রাম্পের স্টেট অফ দ্য ইউনিয়ন ভাষণের কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট করেন। সেখানে তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় উল্লেখ করেন যে, ইরান কোনো পরিস্থিতিতেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না, কারণ এটি তাদের নীতিবিরুদ্ধ। তিনি আরও জানান, পারস্পরিক উদ্বেগ মোকাবিলা এবং উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষার জন্য একটি অভূতপূর্ব চুক্তিতে পৌঁছানোর এক ঐতিহাসিক সুযোগ এখন তাদের সামনে রয়েছে।

তবে তেহরান তাদের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির কোনো ধরনের সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা করতে নারাজ। একইসাথে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের সমর্থনপুষ্ট ‘প্রতিরোধের অক্ষ’ বা ‘অ্যাক্সিস অফ রেসিস্ট্যান্স’—যাদের মধ্যে রয়েছে ফিলিস্তিনের গাজায় হামাস, লেবাননে হিজবুল্লাহ, ইরাকের সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠী এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী—তাদেরকে সমর্থন দেওয়া বন্ধ করার মার্কিন দাবিও সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে ইরান।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও এই ইস্যু নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় চলছে। মঙ্গলবার কংগ্রেসে তার স্টেট অফ দ্য ইউনিয়ন ভাষণে ট্রাম্প ইরান ইস্যু নিয়ে কথা বললেও হামলার সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করেননি। তিনি শুধু বলেন, ইরান এমন সব বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির কাজ করছে যা খুব শিগগিরই সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম হবে। ভাষণের আগে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও সেনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের দলীয় নেতা এবং গোয়েন্দা কমিটির প্রধানদের নিয়ে গঠিত ‘গ্যাং অফ এইট’-কে একটি অতি-গোপন ব্রিফিং দেন। ব্রিফিং শেষে সেনেটের সংখ্যালঘু ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমার এক বিবৃতিতে বলেন, পরিস্থিতি অত্যন্ত গুরুতর এবং ট্রাম্প প্রশাসনের উচিত এ বিষয়ে আমেরিকান জনগণের কাছে তাদের প্রকৃত অবস্থান ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা।


মার্কিন গণমাধ্যমগুলোতে প্রকাশিত একাধিক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসন আসন্ন দিনগুলোতে ইরানের রেভোলিউশনারি গার্ডের সদর দপ্তর বা পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর ওপর প্রাথমিক ও আকস্মিক হামলার কথা গভীরভাবে বিবেচনা করছে। এমনকি আলোচনা ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে ক্ষমতাচ্যুত করার সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে একটি সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরুর নির্দেশও দিতে পারেন বলে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে পেন্টাগনের ভেতরে এ নিয়ে দ্বিমত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান সরাসরি সতর্ক করে বলেছেন যে, ইরানের ওপর এ ধরনের আক্রমণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে এবং এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে একটি অনির্ধারিত ও দীর্ঘমেয়াদি রক্তাক্ত সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে, ট্রাম্প জোর দিয়ে বলছেন যে জেনারেল ড্যান কেইন বিশ্বাস করেন, এই যুদ্ধে মার্কিন বাহিনীর পক্ষে “সহজেই জেতা” সম্ভব।

এই চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে ইন্ধন জোগাচ্ছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এমন যেকোনো চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করেছেন, যেখানে ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রতিরোধ যোদ্ধাদের অর্থায়নের বিষয়টি কঠোরভাবে দমন করা না হয়। চলতি মাসের শুরুতে হোয়াইট হাউজ সফর করা নেতানিয়াহু মূলত ইরানি সরকারের পতনের লক্ষ্যে একটি বড় ধরনের সামরিক অভিযানের পক্ষেই ট্রাম্পের ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়াচ্ছেন।

সব মিলিয়ে জেনেভার এই পরোক্ষ আলোচনাটি কেবল যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের জন্যই নয়, বরং সমগ্র বিশ্বের শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য একটি অগ্নিপরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। আলোচনা ব্যর্থ হলে মধ্যপ্রাচ্যের বুক চিরে যে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হবে, তার প্রভাব পুরো বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতিকে এক খাদের কিনারায় ঠেলে দেবে। ইটিসি বাংলার পাঠকদের জন্য জেনেভা থেকে আসা প্রতিটি মুহূর্তের আপডেট অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন