জুলাই-আগস্টের হত্যা মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিন পেলেন ‘ইয়াবাগডফাদার’ খ্যাত সাবেক এমপি আবদুর রহমান বদি

সাম্প্রতিক সময়ের বহুল আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের একটি মামলায় জামিন পেয়েছেন কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ) আসনের সাবেক বিতর্কিত সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি। বৃহস্পতিবার দুপুরে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ থেকে তাকে এই জামিন দেওয়া হয়। দেশজুড়ে ‘ইয়াবা গডফাদার’ হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত এই রাজনৈতিক নেতার জামিন পাওয়ার খবরটি গণমাধ্যমে আসার পর থেকেই সচেতন মহলে এবং রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি নিজ এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্যের অধিকারী ছিলেন। ছাত্র-জনতার অবিস্মরণীয় আন্দোলনের মুখে ক্ষমতার পালাবদলের পর তার এই আইনি প্রক্রিয়ার সর্বশেষ ধাপটি দেশের বিচারিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।


গত জুলাই ও আগস্ট মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে সারা দেশে যে অভূতপূর্ব ও রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়, তার জেরে ৫ আগস্ট পতন ঘটে দীর্ঘ দেড় দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের। এই গণআন্দোলন কঠোর হাতে দমনের লক্ষ্যে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাংশ সারা দেশে ব্যাপক দমন-পীড়ন ও নির্বিচারে গুলিবর্ষণ চালায়। এতে অসংখ্য নিরীহ ছাত্র ও সাধারণ জনতা নিহত হন। কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফ অঞ্চলেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল। ছাত্র-জনতার ওপর হামলার নির্দেশদাতা, অর্থদাতা এবং সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে দেশব্যাপী সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে অসংখ্য হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। সেই ধারাবাহিকতায় কক্সবাজারের বিতর্কিত নেতা আবদুর রহমান বদির বিরুদ্ধেও হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলা রুজু হয়। বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ দীর্ঘ শুনানি শেষে এই হত্যা মামলায় তাকে জামিন প্রদান করেন। আদালতের এই আদেশের ফলে তার কারামুক্তির ক্ষেত্রে একটি বড় আইনি বাধা কাটল বলে মনে করছেন তার নিয়োজিত আইনজীবীরা।


এর আগে, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যখন দেশজুড়ে বিগত সরকারের সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও প্রভাবশালী নেতাদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়, তখন অন্যান্য অনেকের মতোই দ্রুত আত্মগোপনে চলে যান আবদুর রহমান বদি। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। টানা কয়েক দিন নিখোঁজ থাকার পর, ২০২৪ সালের ২০ আগস্ট রাতে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)। ওই সময় র‍্যাবের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে জানানো হয়েছিল যে, কক্সবাজারের টেকনাফে দায়ের করা একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চট্টগ্রাম শহরের একটি গোপন আস্তানায় তিনি বেশ কিছুদিন ধরে লুকিয়ে ছিলেন। র‍্যাবের এই অভিযানের খবর সে সময় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে প্রধান শিরোনাম হিসেবে জায়গা করে নিয়েছিল, কারণ দীর্ঘকাল ধরে বদি ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকা এক অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, যাকে আইনের আওতায় আনা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করা হতো।


বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আবদুর রহমান বদির নামের সাথে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি জড়িয়ে আছে, তা হলো অবৈধ মাদক ইয়াবার এক বিশাল সাম্রাজ্য। দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্ত, বিশেষ করে উখিয়া ও টেকনাফ রুট ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে আসা লাখ লাখ পিস ইয়াবা চোরাচালানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও নিয়ন্ত্রক হিসেবে বারবার তার নাম উঠে এসেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং দেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি করা শীর্ষ মাদক চোরাকারবারিদের তালিকায় তার নাম সবসময় সর্বাগ্রে অবস্থান করত। এ কারণেই সারা দেশের মানুষের কাছে তিনি ‘ইয়াবা গডফাদার’ বা ইয়াবা সম্রাট নামে সর্বাধিক পরিচিতি পান। নিজের নির্বাচনি এলাকা উখিয়া-টেকনাফে বদির একক আধিপত্য ও ত্রাসের রাজত্ব এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও তার কথার বাইরে যাওয়ার সাহস পেত না। এতসব গুরুতর অভিযোগ এবং দেশব্যাপী সমালোচনা থাকা সত্ত্বেও বিগত সরকারের শীর্ষ মহলের নীরব আশীর্বাদ থাকায় তিনি দীর্ঘদিন বহাল তবিয়তেই ছিলেন।


কেবল ইয়াবা পাচার বা হত্যা মামলাই নয়, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির দায়েও এর আগে বেশ কয়েকবার খবরের শিরোনাম হয়েছেন আবদুর রহমান বদি। বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছিল। সেই মামলায় ২০১৬ সালে ঢাকার একটি বিশেষ জজ আদালত তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেছিল। ওই রায়ের পর তাকে সাময়িকভাবে কারাগারেও যেতে হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে তিনি উচ্চ আদালত থেকে আইনি ফাঁকফোকর গলিয়ে জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসেন। তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের আরও একাধিক অভিযোগ তদন্তাধীন ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি সবসময়ই নিজেকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন।


আবদুর রহমান বদির রাজনৈতিক উত্থান ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসের এক অদ্ভুত অধ্যায়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি কক্সবাজার-৪ আসন থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন তথা নৌকা প্রতীক নিয়ে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সে সময় বিরোধী দলবিহীন নির্বাচনে জয়লাভ করার পর তিনি এলাকায় তার ক্ষমতা আরও সুসংহত করেন। কিন্তু দেশজুড়ে ইয়াবাকাণ্ডে তার সম্পৃক্ততা নিয়ে যখন তীব্র সমালোচনা ও দেশি-বিদেশি চাপ বাড়তে থাকে, তখন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগও দেশজুড়ে ব্যাপক বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে। এর ফলস্বরূপ, ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় হাইকমান্ড তাকে আর সরাসরি মনোনয়ন দেওয়ার ঝুঁকি নেয়নি। তবে চমকপ্রদ ব্যাপার হলো, তাকে বাদ দেওয়া হলেও আওয়ামী লীগ ওই একই আসনে দলীয় মনোনয়ন তুলে দেয় তার স্ত্রী শাহীন আক্তারের হাতে। সর্বশেষ দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনেও তার স্ত্রীই পুনরায় মনোনয়ন পান। শাহীন আক্তার পর পর দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও এটি রাজনৈতিক মহলে সবারই জানা ছিল যে, পর্দার আড়ালে থেকে মূলত আবদুর রহমান বদিই পুরো এলাকার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণ নিজের হাতেই রেখেছিলেন।


বদির হাইকোর্ট থেকে জামিন পাওয়ার এই ঘটনাটি আইনি প্রক্রিয়ার একটি স্বাভাবিক অংশ হলেও, জনমনে এটি ব্যাপক মিশ্র ও নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছে। জুলাই-আগস্টের মতো একটি ঐতিহাসিক ও রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের মামলায় এমন একজন প্রভাবশালী ও দেশব্যাপী বিতর্কিত ব্যক্তির এত দ্রুত জামিন পাওয়াকে সাধারণ মানুষ ও অধিকারকর্মীরা সন্দেহের চোখে দেখছেন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা ও সাধারণ মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর তীব্র সমালোচনা করছেন। তবে আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, হাইকোর্ট কেবল মামলার প্রাথমিক নথিপত্র এবং আইনি দিক বিবেচনা করেই জামিন মঞ্জুর করে থাকেন। এখন দেখার বিষয় হলো, রাষ্ট্রপক্ষ এই জামিন আদেশের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন বা লিভ টু আপিল করে কি না। যদি রাষ্ট্রপক্ষ দ্রুত আপিল করে এবং আপিল বিভাগ জামিন স্থগিত করে, তবে বদির কারামুক্তির বিষয়টি আবারও অনিশ্চয়তায় পড়ে যেতে পারে। অন্যথায়, আইনি প্রক্রিয়া শেষে তার কারাগার থেকে বের হওয়ার পথ প্রশস্ত হবে।

ইটিসি বাংলার পাঠকদের জন্য এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ খবর। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবদুর রহমান বদির মতো বিতর্কিত ব্যক্তিদের উত্থান-পতন দেশের সামগ্রিক শাসনব্যবস্থা, বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার একটি বড় প্রমাণ। জুলাই-আগস্টের হাজারো শহীদের পরিবারের সদস্যরা যখন বুক ভরা আশা নিয়ে ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন, ঠিক তখন এ ধরনের চাঞ্চল্যকর মামলার আসামিদের আইনি গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আগামী দিনগুলোতে এই মামলার আইনি লড়াই কোন দিকে মোড় নেয় এবং দেশের পরিবর্তিত রাজনৈতিক অঙ্গনে এর কী প্রভাব পড়ে, সেদিকেই এখন তীক্ষ্ণ নজর রাখছে সচেতন দেশবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন