“পরমাণু অস্ত্র তৈরির কোনো পরিকল্পনা নেই”, জেনেভায় পরোক্ষ আলোচনার আগে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের কড়া বার্তা

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে সবসময়ই রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। এবার সেই দীর্ঘদিনের জল্পনা ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগে জল ঢেলে দিলেন খোদ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে জানিয়ে দিয়েছেন যে, তার দেশ কোনোভাবেই পরমাণু বা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে নয় এবং এ ধরনের কোনো গোপন এজেন্ডা তেহরানের নেই। এই প্রসঙ্গে তিনি ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির একটি বহু পুরোনো ও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ফতোয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। পেজেশকিয়ান জোর দিয়ে বলেছেন, গণবিধ্বংসী অস্ত্র উৎপাদন ও ব্যবহার ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এর অত্যন্ত সুস্পষ্ট অর্থ হলো, তেহরান কখনোই ধ্বংসাত্মক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পথে হাঁটবে না। স্বনামধন্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট মনিটরের এক বিস্তারিত প্রতিবেদনে এই তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।


ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর, বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সবসময়ই একটি সন্দেহ ছিল যে, তেহরান গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরির চেষ্টা করছে। তবে ইরান সরকার সবসময়ই এই অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে আসছে। এই দাবির পেছনে সবচেয়ে বড় আইনি ও ধর্মীয় ভিত্তি হলো ২০০০ সালের গোড়ার দিকে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দেওয়া একটি ফতোয়া বা ধর্মীয় ডিক্রি। এই ফতোয়ায় তিনি পারমাণবিক অস্ত্রসহ যেকোনো ধরনের গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি, মজুত এবং এর ব্যবহারকে ইসলামি শরিয়ত ও নৈতিকতা অনুযায়ী সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ বা ‘হারাম’ বলে ঘোষণা করেছিলেন। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান সেই ফতোয়ার দিকেই পুনরায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তার এই বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য হলো পশ্চিমা বিশ্বকে আশ্বস্ত করা যে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিছকই শান্তিপূর্ণ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তির চাহিদা মেটানোর জন্য পরিচালিত হচ্ছে।


প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্যটি এমন এক স্পর্শকাতর সময়ে সামনে এলো, যখন সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পরোক্ষ আলোচনায় বসতে যাচ্ছে ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘদিন ধরে চলা দুই দেশের মধ্যকার স্নায়ুযুদ্ধ এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝে এই বৈঠককে বৈশ্বিক রাজনীতির বিশ্লেষকরা অত্যন্ত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন। জেনেভায় অনুষ্ঠিতব্য এই বৈঠকে উভয় পক্ষই সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে একটি কার্যকর কূটনৈতিক সমাধানে পৌঁছানোর ওপর জোর দেবে বলে আশা করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, এই আলোচনাটি সরাসরি বা প্রত্যক্ষ হচ্ছে না, বরং এটি পরোক্ষভাবে পরিচালিত হবে। অর্থাৎ, মার্কিন ও ইরানি প্রতিনিধিরা একই টেবিলে বসবেন না; বরং মধ্যস্থতাকারী দেশের কূটনীতিকদের মাধ্যমে তাদের বার্তা আদান-প্রদান করা হবে।

তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আলোচনার পথটি মোটেও মসৃণ হবে না। কারণ, একদিকে যেমন জেনেভায় আলোচনার টেবিল প্রস্তুত করা হচ্ছে, অন্যদিকে ঠিক সেই সময়েই ওয়াশিংটন ইরানের ওপর নতুন করে একাধিক কঠোর অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। শুধু তাই নয়, মধ্যপ্রাচ্যের মতো একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল অঞ্চলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি এবং শক্তি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এই দ্বিমুখী নীতি ইরানের জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ এবং এটি আলোচনার অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে অনেকেই আশঙ্কা করছেন।


জেনেভার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেওয়ার আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরগচি সংবাদমাধ্যমের সামনে দেশের অবস্থান অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেন। তিনি অত্যন্ত আশাবাদী কণ্ঠে জানান যে, পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে একটি ন্যায্য, ভারসাম্যপূর্ণ এবং ন্যায়সংগত চুক্তি এখনও হাতের নাগালে রয়েছে। অর্থাৎ, যদি উভয় পক্ষ আন্তরিক হয়, তবে দীর্ঘদিনের এই পারমাণবিক সংকটের একটি শান্তিপূর্ণ ও সম্মানজনক সমাধান সম্ভব।

সেই সঙ্গে তিনি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ও কঠোর ভাষায় বলেন যে, ইরান কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে না। তবে তিনি এটিও মনে করিয়ে দেন যে, পারমাণবিক প্রযুক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের যে আইনগত ও আন্তর্জাতিক অধিকার ইরানের রয়েছে, তা থেকে তেহরান কখনোই পিছপা হবে না বা সেই অধিকার কোনো চাপের মুখে ত্যাগ করতে প্রস্তুত নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞান, কৃষি উন্নয়ন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের মতো শান্তিপূর্ণ খাতে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারে ইরান তাদের কাজ স্বতঃস্ফূর্তভাবে চালিয়ে যাবে।


অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে ইরানের এই দাবির প্রতি তীব্র অবিশ্বাস ও কঠোর অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে। বর্তমান মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সম্প্রতি ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে অত্যন্ত বিস্ফোরক ও উদ্বেগজনক কিছু অভিযোগ সামনে এনেছেন। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় মার্কিন হামলার পর থেকে দেশটি তাদের স্থগিত থাকা পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় জোরেশোরে শুরুর সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স তার দেশের নীতির কথা পুনর্ব্যক্ত করে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতিটি এ ক্ষেত্রে খুবই সহজ এবং স্পষ্ট: ইরান কোনো অবস্থাতেই পারমাণবিক অস্ত্র রাখতে পারবে না। যদি তারা পারমাণবিক অস্ত্র পুনর্নির্মাণের বা তৈরির বিন্দুমাত্র চেষ্টা করে, তবে তা আমাদের এবং আমাদের মিত্রদের জন্য বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করবে এবং এর পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ।’ তার এই বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, ওয়াশিংটন কোনোভাবেই তেহরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ছাড় দিতে রাজি নয় এবং প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপ নিতেও তারা পিছপা হবে না।


সার্বিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে এটি অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে ওঠে যে, একদিকে ইরান যেমন তাদের শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির অধিকার আদায়ে বদ্ধপরিকর এবং পারমাণবিক অস্ত্র না বানানোর প্রতিশ্রুতিতে অটল, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও তাদের সন্দেহের জায়গা থেকে এক চুলও সরতে নারাজ। এই দুই মেরুর বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে জেনেভায় আসন্ন পরোক্ষ আলোচনাটি মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক শান্তির জন্য একটি বড় পরীক্ষাক্ষেত্র হতে যাচ্ছে। ইটিসি বাংলার পাঠকদের জন্য এই ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের প্রতিটি মুহূর্তের আপডেট অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এর প্রভাব আন্তর্জাতিক তেলের বাজার থেকে শুরু করে বিশ্ব অর্থনীতি পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন গভীর আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে জেনেভার দিকে—দেখার বিষয়, শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে কূটনীতির জয় হয়, নাকি নতুন করে কোনো সংঘাতের কালো মেঘ ঘনিয়ে আসে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন