ফরিদপুর সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত ফরিদপুর-৩ সংসদীয় আসনটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) একটি অন্যতম দুর্ভেদ্য এবং শক্ত ঘাঁটি হিসেবে যুগ যুগ ধরে পরিচিত। বিশেষ করে ফরিদপুর শহরের ঐতিহ্যবাহী ও প্রভাবশালী ‘ময়েজ মঞ্জিল’ পরিবারের কোনো সদস্য যদি এই আসনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রার্থী হন, তবে সেখানে দলটির রাজনৈতিক অবস্থান এবং জনসমর্থন কার্যত অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। দলীয় ধানের শীষ প্রতীক এবং ময়েজ মঞ্জিলের ঐতিহ্য—এই দুটি শক্তিশালী উপাদানই পুরোপুরি বিএনপির পক্ষে ছিল। তারপরও এবারের নির্বাচনে জয়মাল্য ছিনিয়ে আনতে দলটির হেভিওয়েট প্রার্থী নায়াব ইউসুফকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে।
নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নায়াব ইউসুফ বিজয়ের হাসি হাসলেও, এই আসনের নির্বাচনী ফলাফলে সবচেয়ে বড় চমক হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর অস্বাভাবিক ও অবিশ্বাস্য ভোটবৃদ্ধি। জামায়াতের এই বিপুল ভোট প্রাপ্তি খোদ বিএনপির শীর্ষ নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদেরও চরম বিস্ময়ের ঘোরে ফেলে দিয়েছে।
ফরিদপুর-৩ আসনের অতীত নির্বাচনী ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, এই আসনে অতীতে দলীয়ভাবে বা জোটগতভাবে নির্বাচন করে জামায়াতে ইসলামী কখনোই ৩০ হাজারের বেশি ভোটের গণ্ডি পার হতে পারেনি। কিন্তু এবারের নির্বাচনে সমস্ত অতীত সমীকরণ ও হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়ে দলটির মনোনীত প্রার্থী আবদুত তাওয়াব একাই পেয়েছেন ১ লাখ ২৪ হাজার ১১৫ ভোট। বিজয়ী বিএনপি প্রার্থী নায়াব ইউসুফের চেয়ে তিনি মাত্র ২৪ হাজার ৪৩০ ভোটে পিছিয়ে থেকে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছেন। একটি আসনে যেখানে জামায়াতের ভোটব্যাংক ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল বলে পরিচিত ছিল, সেখানে এককভাবে লাখের ওপর ভোট পাওয়াকে স্থানীয় রাজনীতির এক নতুন মেরুকরণ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
১৯৯১ সাল থেকে শুরু করে পরবর্তী নির্বাচনগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে জামায়াতের এই অভাবনীয় উত্থানের চিত্রটি আরও পরিষ্কার হয়ে ওঠে। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এই আসনে জামায়াতের প্রাপ্ত ভোট সর্বদাই ১৬ থেকে ৩০ হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ওই সময়গুলোতে দলটির হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন জামায়াতের তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ।
১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী ও ময়েজ মঞ্জিল পরিবারের কৃতী সন্তান, দলটির তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ ৬২ হাজার ৪৩২ ভোট পেয়ে বিপুল ব্যবধানে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। সেই নির্বাচনে জামায়াত প্রার্থী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ পেয়েছিলেন মাত্র ১৬ হাজার ৫০২ ভোট। এরপর ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের বহুল আলোচিত সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও কামাল ইবনে ইউসুফ ৬০ হাজার ৭৭৯ ভোট পেয়ে পুনরায় নির্বাচিত হন। সে সময় মুজাহিদের ভোট আরও কমে দাঁড়ায় ১২ হাজার ৩৩৪-এ। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতের সমন্বয়ে চারদলীয় জোট গঠিত হলে, এই আসনে জোটের একক প্রার্থী হিসেবে কামাল ইবনে ইউসুফ বিশাল জয় পান।
তবে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সমীকরণ কিছুটা বদলে যায়। ওই নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের প্রার্থী হিসেবে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেন জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। অন্যদিকে, কামাল ইবনে ইউসুফ দলের সিদ্ধান্তে নাখোশ হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ওই ত্রিমুখী নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী খন্দকার মোশাররফ হোসেন ১ লাখ ২২ হাজার ৪৭ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েও কামাল ইবনে ইউসুফ পান ৭৬ হাজার ৪৭৮ ভোট এবং জোটের হেভিওয়েট প্রার্থী হওয়া সত্ত্বেও মুজাহিদ মাত্র ৩০ হাজার ৮২১ ভোট পেয়েছিলেন। সেই প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এবারের নির্বাচনে আবদুত তাওয়াবের সোয়া লাখ ভোট পাওয়া সত্যিই অভাবনীয়।
বিজয়ী প্রার্থী নায়াব ইউসুফ কেবল একজন রাজনৈতিক নেতাই নন, তিনি এক বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তার দাদা ইউসুফ আলী চৌধুরীকে বৃহত্তর ফরিদপুরের স্থানীয় রাজনীতিতে অঘোষিত ‘কিং মেকার’ বলা হতো। সাধারণ মানুষের কাছে তার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ছিল। নায়াব ইউসুফের বাবা চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ ফরিদপুর অঞ্চলে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বাবার হাত ধরেই এই আসন থেকে তিনি টানা পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন। এমন একটি সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েও নায়াব ইউসুফকে এবারের নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থীর কাছ থেকে কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হতে হয়েছে।
ময়েজ মঞ্জিলের মতো শক্তিশালী দুর্গে জামায়াতের প্রার্থীর এই অভাবনীয় ভোটবৃদ্ধিকে অত্যন্ত বিস্ময়কর বলে অভিহিত করেছেন খোদ বিজয়ী প্রার্থী নায়াব ইউসুফ। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর প্রথম আলোকে দেওয়া এক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেন, ‘জামায়াত প্রার্থী হঠাৎ করে এত বিপুল পরিমাণ ভোট কীভাবে পেল, তা আমার কিছুতেই মাথায় আসছে না। আমি ভোটের এই হিসাব মেলাতে পারছি না।’ তিনি জানান, ফরিদপুর সদর উপজেলার যেসব ভোটকেন্দ্রে জামায়াত অপ্রত্যাশিতভাবে বেশি ভোট পেয়েছে, সেগুলোর একটি সুনির্দিষ্ট তালিকা তৈরি করে এই অনাকাঙ্ক্ষিত ফলাফলের পেছনের প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের জন্য তিনি ইতোমধ্যে স্থানীয় নেতা-কর্মীদের কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন।
একই সুর ধ্বনিত হয়েছে জেলা বিএনপির সদস্যসচিব এ কে এম কিবরিয়া স্বপনের কণ্ঠেও। তিনি ইটিসি বাংলাকে জানান, ‘নির্বাচনের আগে আমাদের যেমন ভালো ফল করার প্রত্যাশা ছিল এবং মাঠের যে চিত্র আমরা দেখেছি, ব্যালট বাক্সে আমরা ঠিক তেমনটি করতে পারিনি। আমরা অতি দ্রুত কেন্দ্রভিত্তিক ভোটের ফলাফল বিশ্লেষণ করব। কোথায় আমাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা ছিল এবং কেন একটি নির্দিষ্ট কেন্দ্রে আমাদের ভোট কমে গেল, তা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে চিহ্নিত করে অবিলম্বে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
দলীয় ও স্থানীয় রাজনৈতিক সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, এবারের নির্বাচনে বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলে ১১-দলীয় জোটের পক্ষ থেকে দুটি আসনকে বিশেষভাবে টার্গেট করেছিল জামায়াতে ইসলামী। এগুলো হলো বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা ও মধুখালী উপজেলা নিয়ে গঠিত ফরিদপুর-১ এবং সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত ফরিদপুর-৩ আসন। এই দুটি আসনেই জোটের পক্ষ থেকে জামায়াতের একক প্রার্থী দেওয়া হয়েছিল।
নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান সারা দেশের সব নির্বাচনী এলাকায় না গেলেও ফরিদপুর-১ এবং ফরিদপুর-৩ আসনে এসে অত্যন্ত জনবহুল ও পৃথক দুটি নির্বাচনী জনসভা করেন। মজার বিষয় হলো, গত ৪ ফেব্রুয়ারি শহরের ঐতিহাসিক সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এক বিশাল জনসভা করেন। ঠিক তার মাত্র দুই দিন পর একই স্থানে বিশাল শোডাউন করে জামায়াতের জনসভা অনুষ্ঠিত হয়, যা স্থানীয় ভোটারদের মাঝে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত ফরিদপুর-১ আসনে জামায়াতের প্রার্থী বিজয়ী হলেও, ফরিদপুর-৩-এ জয় তাদের কাছে অধরাই থেকে যায়।
ফরিদপুর-৩ আসনে জামায়াতের প্রার্থী আবদুত তাওয়াব দলটির কেন্দ্রীয় শুরা কমিটির একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য এবং স্থানীয়ভাবে একজন অত্যন্ত সজ্জন কলেজশিক্ষক হিসেবেও ব্যাপকভাবে পরিচিত। আজ শনিবার সকালে নির্বাচনের সামগ্রিক ফলাফল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সাধারণ মানুষের মধ্যে জামায়াতের পক্ষে একটি নীরব কিন্তু শক্তিশালী গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। দলের পাশাপাশি প্রার্থীর পরিচ্ছন্ন ব্যক্তি ইমেজও এখানে বড় ভূমিকা রেখেছে।’
তিনি রাজনৈতিক সমীকরণের ব্যাখ্যা দিয়ে আরও বলেন, ‘অতীতে এই অঞ্চলের সাধারণ ভোটারদের মধ্যে একটি প্রবণতা ছিল যেভাবেই হোক “আওয়ামী লীগ ঠেকাও”। এই স্লোগানের কারণে সরকারবিরোধী অনেক সাধারণ সমর্থক ও ভোটার বাধ্য হয়ে বিএনপির প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন। কিন্তু এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকায় সেই পরিস্থিতি ছিল না। ফলে সাধারণ ভোটাররা কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে নিজেদের পছন্দমতো প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন।’
অল্পের জন্য পরাজয়ের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে জামায়াতের এই শীর্ষ নেতা কিছুটা আক্ষেপের সুরেই বলেন, ‘আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে যে, স্থানীয় আওয়ামী লীগের একটি বড় অংশ সুকৌশলে বিএনপির প্রার্থীর সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি শহরের বড় ব্যবসায়ী এবং প্রভাবশালী মহলের একচেটিয়া সমর্থন নায়াব ইউসুফের পক্ষেই গেছে। এছাড়া আমরা যে হারে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোট পাওয়ার প্রত্যাশা করেছিলাম, তা আমরা পাইনি। এই বিষয়গুলোই মূলত আমাদের জয়ের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
ফরিদপুর-৩ আসনের এই নির্বাচনী ফলাফল প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের তৃণমূল রাজনীতিতে ভোটারদের মনস্তত্ত্বে এক নীরব ও গুণগত পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। ময়েজ মঞ্জিলের মতো ঐতিহ্যবাহী দুর্গ জয় করতে পারলেও, জামায়াতে ইসলামীর এই বিপুল জনসমর্থন আগামী দিনে বৃহত্তর ফরিদপুরে বিএনপির জন্য একটি বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ হিসেবেই আবির্ভূত হবে বলে মনে করছেন ইটিসি বাংলার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। আগামী দিনগুলোতে এই অঞ্চলে রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াই যে আরও তীব্র হবে, তা এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
