সৌদি প্রো লিগের মৌসুমের শিরোপার দৌড়ে হঠাৎ করেই যেন খেই হারিয়ে ফেলেছিল মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ফুটবল ক্লাব আল নাসর । দলের বাজে পারফরম্যান্স, পয়েন্ট টেবিলে অপ্রত্যাশিতভাবে পিছিয়ে পড়া এবং ক্লাবের দলবদল নীতি নিয়ে ভেতরে ভেতরে পুঞ্জীভূত হচ্ছিল চরম অসন্তোষ। পরিস্থিতি এতটাই ঘোলাটে হয়ে উঠেছিল যে, ক্লাবের রিক্রুটমেন্ট বা দলবদল নীতির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে একপর্যায়ে অঘোষিত ধর্মঘটে গিয়েছিলেন লিগের সবচেয়ে বড় তারকা এবং বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম কিংবদন্তি ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। চারদিকে যখন সমালোচনার ঝড়, ক্রীড়া বিশ্লেষকরা যখন আল নাসরের লিগ শিরোপার স্বপ্ন প্রায় শেষ বলে ধরে নিয়েছিলেন, ঠিক তখনই যেন ফিনিক্স পাখির মতো ভস্ম থেকে উড়ে এল আল নাসর। দুঃসময় আর চারপাশের নেতিবাচক আলোচনাই যেন আল নাসর এবং তাদের অধিনায়ক ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোকে নতুন করে তাতিয়ে দিয়েছে। যার ফলস্বরূপ টানা জয়ে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আল হিলালকে পেছনে ফেলে পয়েন্ট টেবিলের একেবারে শীর্ষস্থান বীরদর্পে দখল করে নিয়েছে রোনালদোর দল।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) রাতে রিয়াদের আল আওয়াল পার্কে যেন এক অন্যরকম জাদুকরী ফুটবল উৎসবের সাক্ষী হলো হাজারো দর্শক। এদিন লিগ ম্যাচে প্রতিপক্ষ আল হাজেমকে আক্ষরিক অর্থেই মাঠে খুঁজেই পাওয়া যায়নি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরো ম্যাচে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আল হাজেমকে ৪-০ গোলের বিশাল ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়েছে স্বাগতিক আল নাসর। দলের এই দাপুটে ও বড় জয়ের দিনে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন স্বয়ং ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। তিনি একাই করেছেন দুর্দান্ত জোড়া গোল। দলের পক্ষে বাকি গোল দুটি এসেছে ফরাসি তারকা কিংসলে এবং ব্রাজিলিয়ান তরুণ ও প্রতিশ্রুতিশীল প্রতিভা অ্যাঞ্জেলো গ্যাব্রিয়েলের পা থেকে।
এই রোমাঞ্চকর জয়ের মধ্য দিয়ে সৌদি প্রো লিগের পয়েন্ট টেবিলে এসেছে বড় ধরনের রদবদল, যা লিগের উত্তেজনাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বর্তমানে লিগের ২২ ম্যাচ শেষে ১৮টি জয় এবং ১টি ড্রয়ের সুবাদে আল নাসরের মোট সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ৫৫ পয়েন্ট। এই ৫৫ পয়েন্ট নিয়ে তারা চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী নেইমার জুনিয়রের দল আল হিলালকে টপকে লিগ টেবিলের এক নম্বর স্থানটি নিজেদের করে নিয়েছে। সমান ২২ ম্যাচ খেলে আল হিলালের বর্তমান সংগ্রহ ৫৪ পয়েন্ট। মাত্র এক পয়েন্টের এই সূক্ষ্ম ব্যবধান শিরোপার লড়াইকে করে তুলেছে আরও বেশি আকর্ষণীয়, তীব্র ও স্নায়ুক্ষয়ী।
ঘরের মাঠে শুরু থেকেই আল হাজেমের ওপর চড়াও হয়ে খেলতে থাকে লুইস কাস্ত্রোর শিষ্যরা। বল পজেশন থেকে শুরু করে আক্রমণাত্মক পাসিং—সব জায়গাতেই ছিল রোনালদোদের একাধিপত্য। পুরো ম্যাচের ৫৬ শতাংশ সময় বল নিজেদের পায়ে রেখেছিল আল নাসর। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ছিন্নভিন্ন করে তারা মোট ১৩টি শট নেয়, যার মধ্যে ১০টি শটই ছিল সরাসরি লক্ষ্যের দিকে । অন্যদিকে, আল নাসরের জমাট রক্ষণে কোনো কাঁপনই ধরাতে পারেনি সফরকারী আল হাজেম। পুরো ম্যাচে তারা মাত্র ২টি শট নিতে সক্ষম হয়, যার মধ্যে কেবল ১টি ছিল লক্ষ্যে। পরিসংখ্যানই স্পষ্টভাবে বলে দেয়, ম্যাচটি কতটা একপেশে ছিল এবং আল নাসর কতটা আগ্রাসী ফুটবল খেলেছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল উপহার দেওয়া আল নাসর প্রথম গোলের দেখা পায় ১৩তম মিনিটেই। কিংসলে কোম্যানের দেওয়া একটি দুর্দান্ত থ্রু পাস থেকে বল অনায়াসে জালে জড়ান ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো। তবে শুরুতে অফসাইডের অজুহাত দেখিয়ে গোলটি বাতিল করে দেন মাঠের রেফারি। পরে ভিএআর প্রযুক্তির সাহায্যে দীর্ঘক্ষণ চেক করার পর রেফারি নিজের ভুল বুঝতে পারেন, সিদ্ধান্ত বদলান এবং গোলের বাঁশি বাজান। উল্লাসে ফেটে পড়ে গোটা আল আওয়াল পার্ক।
এরপর ৩০ মিনিটের মাথায় দলের লিড দ্বিগুণ করেন ফরাসি উইঙ্গার কিংসলে কোম্যান। পর্তুগিজ তারকা জোয়াও ফেলিক্সের নিখুঁত ও বুদ্ধিদীপ্ত এক পাস থেকে বল পেয়ে চমৎকার ফিনিশিংয়ে গোলটি করেন তিনি। প্রথমার্ধের ৩৭ মিনিটের মাথায় মিডফিল্ডার মার্সেলো ব্রোজোভিচের একটি লম্বা ক্রস দারুণ দক্ষতায় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আবারও বল জালে পাঠিয়েছিলেন রোনালদো। কিন্তু এবার দুর্ভাগ্যজনকভাবে অফসাইডের ফাঁদে পড়ায় সেই গোলটি রেফারি বাতিল করে দেন। ২-০ গোলের স্বস্তিদায়ক লিড নিয়ে বিরতিতে যায় আল নাসর।
দ্বিতীয়ার্ধেও আক্রমণের ধার বিন্দুমাত্র কমায়নি স্বাগতিকরা। ৬৫ এবং ৬৬ মিনিটে পরপর দুটি ভয়ংকর ও জোরালো শট নেন রোনালদো, কিন্তু আল হাজেমের গোলরক্ষক অসাধারণ রিফ্লেক্স দেখিয়ে শট দুটি প্রতিহত করে দলকে আরও বড় লজ্জার হাত থেকে সাময়িকভাবে বাঁচান। তবে আল নাসরের এই অপ্রতিরোধ্য আক্রমণ রুখে দেওয়া বেশিক্ষণ সম্ভব হয়নি। ৭৭ মিনিটের মাথায় দুর্দান্ত এক দর্শনীয় শটে দলের হয়ে তৃতীয় গোলটি করে ব্যবধান আরও বাড়িয়ে দেন তরুণ অ্যাঞ্জেলো গ্যাব্রিয়েল। ঠিক এর দুই মিনিট পর, অর্থাৎ ৭৯ মিনিটে দলের চতুর্থ এবং নিজের ব্যক্তিগত দ্বিতীয় গোলটি আদায় করে নেন সিআরসেভেন। এর ফলে ৪-০ গোলের বিশাল জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে আল নাসর।
বয়স যে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর কাছে স্রেফ একটি সংখ্যা মাত্র, তা তিনি এই ম্যাচে আবারও বিশ্ববাসীকে প্রমাণ করে দেখালেন। চলতি মৌসুমে আল নাসরের জার্সিতে লিগে ১৯ ম্যাচ খেলে ইতোমধ্যে ২০টি গোল করে ফেলেছেন এই পর্তুগিজ মহাতারকা, যা লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় তাকে শীর্ষে রেখেছে। ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য ও অবিশ্বাস্য রেকর্ড গড়েছেন তিনি। পরিসংখ্যান বলছে, বয়স ৩০ পার হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত তিনি ৫০০-এর বেশি গোল করেছেন, যা ফুটবল বিশ্বে এক বিরল দৃষ্টান্ত। সব মিলিয়ে ক্লাব ও জাতীয় দল মিলে ক্যারিয়ারে তার মোট গোলসংখ্যা গিয়ে দাঁড়াল ৯৬২-তে। ১০০০ গোলের যে জাদুকরী মাইলফলকের স্বপ্ন তিনি দেখছেন, তা এখন আর খুব বেশি দূরে নয় বলে মনে করছেন ফুটবল বিশ্লেষকরা।
সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় মিডিয়াগুলোতে জোর গুঞ্জন উঠেছিল যে, ক্লাবের পলিসি নিয়ে অসন্তুষ্ট রোনালদো হয়তো আল নাসর বা সৌদি আরব ছাড়ার কথা গুরুত্বের সাথে ভাবছেন। কিন্তু আল হাজেমের বিপক্ষে জোড়া গোল এবং দলকে শীর্ষে তোলার পর ম্যাচ শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে সব গুঞ্জনে এক নিমিষেই জল ঢেলে দেন তিনি।
সৌদি আরবের প্রতি নিজের গভীর ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে ইটিসি বাংলার এই প্রতিবেদনে রোনালদোর মন্তব্য তুলে ধরা হলো। তিনি অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “আমি সৌদিকে ধারণ করি, এখানেই খেলতে চাই আমি।”
পর্তুগিজ এই কিংবদন্তি আরও যোগ করেন, “আমি এই কথাটা আগেও বহুবার প্রকাশ্যে বলেছি…আমি সৌদি আরবকে নিজের হৃদয়ে ধারণ করি। এটা সেই দেশ, যারা আমাকে অত্যন্ত উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছে। শুধু আমাকে নয়, একইভাবে আমার পরিবার এবং আমার বন্ধুদেরও পরম মমতায় আপন করে নিয়েছে এই দেশ। আমি এই দেশে, এখানকার সংস্কৃতিতে সত্যিই খুব সুখে আছি। আমার সিদ্ধান্ত একেবারে পরিষ্কার, আমি এখানেই থাকতে চাই এবং আল নাসরের হয়ে আরও অনেক বড় বড় শিরোপা জিততে চাই।”
সব মিলিয়ে, আল নাসরের এই অবিস্মরণীয় প্রত্যাবর্তন শুধু একটি দলের জয়ে ফেরার সাধারণ গল্প নয়, বরং এটি একজন বিশ্বমানের নেতার তীব্র মানসিক শক্তির জোরে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো বুঝিয়ে দিয়েছেন, যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি দলকে এক সুতোয় গেঁথে সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে নিয়ে যেতে সক্ষম। এখন দেখার বিষয়, চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আল হিলালকে পেছনে ফেলে লিগ টেবিলের এই শীর্ষস্থান আল নাসর শেষ পর্যন্ত ধরে রেখে শিরোপা উল্লাস করতে পারে কি না। সেই সাথে পুরো ফুটবল বিশ্বের চোখ এখন রোনালদোর দিকেই নিবদ্ধ—কবে তিনি তার অধরা ১০০০ গোলের মাইলফলক স্পর্শ করে ইতিহাসের পাতায় নিজেকে আরও অমর করে তুলবেন।
