বলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে নিজের অভিনয় দক্ষতা এবং ভিন্নধর্মী চরিত্র নির্বাচনের মাধ্যমে যারা খুব অল্প সময়েই দর্শকদের হৃদয়ে স্থায়ী আসন গড়ে নিয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন তাপসী পান্নু। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই তিনি গ্ল্যামারাস চরিত্রের চেয়ে নারীকেন্দ্রিক এবং শক্তিশালী গল্পের দিকে বেশি ঝুঁকেছেন। ‘পিঙ্ক’, ‘থাপ্পড়’, ‘নাম শাবানা’ কিংবা হালের ‘ডানকি’-এর মতো সিনেমায় তার অনবদ্য অভিনয় তাকে বলিউডের প্রথম সারির অভিনেত্রীদের কাতারে নিয়ে গেছে। তবে রূপালি পর্দার এই দাপুটে অভিনেত্রী নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে বরাবরই ছিলেন বেশ রাখঢাক স্বভাবের। বিশেষ করে নিজের প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে সংবাদমাধ্যমে কখনোই খুব একটা মুখ খোলেননি তিনি। কিন্তু সম্প্রতি একটি জনপ্রিয় গণমাধ্যমকে দেওয়া এক দীর্ঘ ও অন্তরঙ্গ সাক্ষাৎকারে নিজের প্রেম, বিয়ে এবং সংসার জীবন নিয়ে প্রথমবারের মতো খোলামেলা কথা বলেছেন এই বলি-সুন্দরী।
সাধারণত আমাদের সমাজে প্রচলিত একটি ধারণা রয়েছে যে, বিয়ের পর মেয়েদের জীবনে আমূল পরিবর্তন আসে। অনেক ক্ষেত্রে ক্যারিয়ারের গতি ধীর হয়ে যায় কিংবা সংসারের চাপে ব্যক্তি স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হয়। কিন্তু তাপসী পান্নু যেন এই প্রচলিত ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুর একজন মানুষ। সাক্ষাৎকারে যখন তাকে তার বিয়ে পরবর্তী জীবন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়, তখন তিনি অত্যন্ত সাবলীল ও হাসিমুখে জবাব দেন। তাপসী জানান, বিয়ের পর তার জীবনে বড় কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং বিবাহিত জীবনকে তিনি কখনোই আলাদা কোনো ‘বোঝা’ বা অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে মনে করেন না।
তাপসীর এই অকপট স্বীকারোক্তি তার ভক্তদের বেশ অবাক করেছে। তিনি বলেন, “সত্যি কথা বলতে কী, আমি মাঝে মাঝে ভুলেই যাই যে আমি একজন বিবাহিত নারী। আমার জীবনের চাকা ঠিক আগের গতিতেই চলছে। বিয়ের আগে আমি যেমন স্বাধীনভাবে কাজ করতাম, নিজের মতো করে সময় কাটাতাম, বিয়ের পরও তার কোনো ব্যতিক্রম হয়নি।” তার এই বক্তব্যের মাধ্যমে স্পষ্টতই বোঝা যায় যে, সংসার এবং ক্যারিয়ার—দুটি দিকই তিনি অত্যন্ত সফলভাবে সামলাচ্ছেন এবং কোনো নতুন পরিস্থিতির বাড়তি চাপ তাকে নিতে হয়নি।
তাপসী পান্নুর স্বামী ম্যাথিয়াস বো (Mathias Boe) কোনো বলিউড তারকা নন। তিনি হলেন ডেনমার্কের একজন বিশ্বখ্যাত ব্যাডমিন্টন তারকা এবং অলিম্পিক পদকজয়ী খেলোয়াড়। বিনোদন জগতের চাকচিক্য থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগতের মানুষের সঙ্গে তাপসীর এই প্রেম কাহিনী যেন কোনো রোমান্টিক সিনেমার গল্পকেও হার মানায়।
সাক্ষাৎকারে তাপসী তাদের প্রথম পরিচয়ের স্মৃতিচারণ করেন। ২০১৩ সালে ভারতে আয়োজিত ‘ইন্ডিয়ান ব্যাডমিন্টন লিগ’ (Indian Badminton League)-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ম্যাথিয়াস বো-র সঙ্গে প্রথমবারের মতো দেখা হয় তাপসীর। সেই প্রথম দেখাতেই দুজনের মধ্যে ভালো লাগা তৈরি হয়, যা পরবর্তীতে প্রণয়ে রূপ নেয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, বলিউড বা পাপারাজ্জিদের তীক্ষ্ণ নজর এড়িয়ে তারা দীর্ঘ ১১ বছর নিজেদের এই প্রেমের সম্পর্ক অত্যন্ত সন্তর্পণে গোপন রেখেছিলেন। তাপসী জানান, দীর্ঘ এক দশকের এই সম্পর্কের ভিত্তি এতটাই মজবুত ছিল যে, বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর নতুন করে কোনো মানসিক চাপ বা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি।
প্রতিটি সম্পর্কেরই কিছু নিজস্ব রসায়ন থাকে। তাপসী ও ম্যাথিয়াসের দীর্ঘ ১১ বছরের প্রেমের সম্পর্কেও ছিল এক অদ্ভুত সুন্দর বোঝাপড়া। তাপসী জানান, বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগে ম্যাথিয়াসের কাছে তার কেবল একটাই শর্ত ছিল। আর সেই শর্তটি হলো— বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রী তকমা লাগার কারণে তাদের দুজনের মধ্যকার সেই পুরনো রসায়ন যেন কোনোভাবেই বদলে না যায়।
তাপসী বলেন, “আমরা একে অপরের খুব ভালো বন্ধু ছিলাম। আমি চেয়েছিলাম বিয়ের পরেও যেন আমাদের সেই বন্ধুত্বের জায়গাটা অটুট থাকে। স্বামী-স্ত্রীর সামাজিক নিয়মের বেড়াজালে যেন আমাদের স্বতঃস্ফূর্ততা হারিয়ে না যায়। বাস্তবেও ঠিক তাই হয়েছে। ম্যাথিয়াস অত্যন্ত বুঝদার একজন মানুষ এবং বিয়ের পর আমাদের সম্পর্ক আগের চেয়ে আরও বেশি মধুর হয়েছে।”
দীর্ঘ ১১ বছরের প্রেমকে পূর্ণতা দিতে ২০২৪ সালের মার্চ মাসে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন তাপসী ও ম্যাথিয়াস। ভারতের রাজস্থান রাজ্যের ঐতিহাসিক শহর উদয়পুরে অত্যন্ত রাজকীয় অথচ ছিমছাম ও ঘরোয়া পরিবেশে তাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। তারকাদের বিয়ে মানেই মিডিয়ার জাঁকজমকপূর্ণ উপস্থিতি—এমন ধারণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তাপসী তার বিয়েতে কোনো সংবাদমাধ্যমের উপস্থিতি রাখেননি।
কেবল দুই পরিবারের ঘনিষ্ঠ সদস্য এবং কাছের কয়েকজন বন্ধু-বান্ধবের উপস্থিতিতে এই জুটির চার হাত এক হয়। বিয়ের খবরটি শুরুতে গণমাধ্যমের কাছ থেকে সম্পূর্ণ গোপন রাখা হয়েছিল। এমনকি বিয়ের কোনো ছবিও তারা তাৎক্ষণিকভাবে প্রকাশ করেননি। তবে বিয়ের কিছুদিন পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের বিয়ের কিছু এক্সক্লুসিভ ছবি এবং একটি বিশেষ নাচের ভিডিও ভাইরাল হয়ে যায়। ভাইরাল হওয়া সেই ভিডিওতে দেখা যায়, বিয়ের আসরে তাপসী প্রচলিত কোনো দুঃখের গান নয়, বরং একটি বেশ মজাদার গানে নাচতে নাচতে বরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। এই ভিডিওটি নেটিজেনদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।
ইটিসি বাংলার বিনোদন বিশ্লেষকদের মতে, তাপসী পান্নুর এই জীবনদর্শন বর্তমান প্রজন্মের অনেক কর্মজীবী ও স্বাধীনচেতা নারীর জন্য একটি বড় অনুপ্রেরণা। সংসার মানেই যে ক্যারিয়ারের ইতি টানা নয়, বরং সঠিক বোঝাপড়া এবং মানসিক শান্তি থাকলে বিয়ের পরও যে সমান তালে নিজের স্বপ্নপূরণের পথে এগিয়ে যাওয়া যায়—তাপসী তারই এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
বিয়ের পর তাপসী তার ক্যারিয়ারে কোনো বিরতি নেননি। একের পর এক নতুন সিনেমার শুটিং নিয়ে তিনি এখন তুমুল ব্যস্ত সময় পার করছেন। ম্যাথিয়াসের মতো একজন সাপোর্টিভ জীবনসঙ্গী পাশে থাকায় তাপসী এখন আগের চেয়ে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী। নিজের কাজের প্রতি তার একাগ্রতা এবং সংসার জীবনের প্রতি তার এই সহজ-সরল দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে যে, তিনি সত্যিই বলিউডের অন্যতম ‘বস লেডি’। আগামী দিনগুলোতেও তাপসী তার দুর্দান্ত অভিনয় দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করে যাবেন—এমনটাই প্রত্যাশা তার অগণিত ভক্ত-অনুরাগীদের।
