রাজধানীর মোহাম্মদপুর, বসিলা, আদাবর এবং বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকাগুলোতে আবারও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজ এবং সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্য। দীর্ঘদিন ধরে এই এলাকাগুলো অপরাধীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হলেও সম্প্রতি তাদের অপতৎপরতা অতীতের সকল মাত্রাকে ছাড়িয়ে গেছে। দিনে-দুপুরে প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে ছিনতাই, ঈদ বা বিভিন্ন উৎসবকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে চাঁদা আদায় এবং দাবিকৃত চাঁদা না পেলে নিরীহ মানুষের ওপর সশস্ত্র হামলার মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনাগুলো এখন এই এলাকার নিত্যনৈমিত্তিক চিত্রে পরিণত হয়েছে। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে স্থানীয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা চরম নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন।
সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শনিবার রাতে আদাবর এলাকায় অবস্থিত ‘আবির ফ্যাশন’ নামের একটি এমব্রয়ডারি কারখানায় এক ভয়াবহ ও বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটেছে। জানা যায়, সামনে আসন্ন ঈদকে কেন্দ্র করে স্থানীয় চিহ্নিত সন্ত্রাসী ‘কালা রাসেল’ গ্রুপের সদস্যরা ওই এমব্রয়ডারি কারখানার মালিক মোস্তাফিজুর রহমানের কাছে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে আসছিল। কিন্তু মালিকপক্ষ এই অন্যায্য চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে শনিবার রাতে কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসী বাহিনীর একদল সশস্ত্র সদস্য কারখানাটিতে অতর্কিত হামলা চালায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, সন্ত্রাসীদের হাতে রামদা, চাপাতিসহ দেশীয় ধারালো অস্ত্রশস্ত্র ছিল। তারা কারখানায় প্রবেশ করেই ব্যাপক ভাঙচুর শুরু করে এবং সেখানে কর্মরত নিরীহ কর্মচারীদের ওপর এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে। এই আকস্মিক ও নৃশংস হামলায় কারখানার অন্তত তিনজন কর্মচারী গুরুতর আহত হন। তাদের শরীর থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হয় এবং তাৎক্ষণিকভাবে তাদের উদ্ধার করে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজদের উৎপাতে অতিষ্ঠ স্থানীয় ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের ধৈর্যের বাঁধ শনিবার রাতের এই ঘটনার পর ভেঙে যায়। কারখানায় হামলার খবর ছড়িয়ে পড়লে আদাবর এলাকার অন্যান্য এমব্রয়ডারি কারখানার মালিক, কর্মচারী এবং স্থানীয় সাধারণ জনতা তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন। বিক্ষুব্ধ জনতা তাৎক্ষণিকভাবে সংঘবদ্ধ হয়ে সন্ত্রাসী কালা রাসেলের বাবাকে আটক করতে সক্ষম হয়।
পরবর্তীতে এই সন্ত্রাসীদের দ্রুত গ্রেফতার ও নিজেদের জানমালের নিরাপত্তার দাবিতে শত শত মানুষ আদাবর থানার সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকেন। এক পর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা থানা ঘেরাও করে রাখেন এবং থানার সামনের মূল সড়কে অবস্থান নেন। এতে করে ওই এলাকার যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায় এবং চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হলে দ্রুত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। সেনাবাহিনীর কঠোর ও পেশাদার হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হয় এবং যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
অন্যদিকে, মোহাম্মদপুরের বসিলার তিন রাস্তার মোড় এলাকার একটি সিসিটিভি (CCTV) ক্যামেরার ফুটেজ সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, যা দেখে শিউরে উঠেছেন খোদ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও। ওই ফুটেজে স্পষ্ট দেখা যায়, দিনে-দুপুরে সম্পূর্ণ প্রকাশ্য দিবালোকে এক পথচারীকে টার্গেট করে ছিনতাইয়ের চেষ্টা চালাচ্ছে কিশোর গ্যাংয়ের কয়েকজন সদস্য।
ফুটেজে দেখা যায়, পথচারী নিজের সর্বস্ব রক্ষার্থে ছিনতাইকারীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে লিপ্ত হন। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই সংঘবদ্ধ গ্যাংয়ের সদস্যরা তাদের প্যান্টের ভেতর থেকে ধারালো অস্ত্র বের করে ওই পথচারীকে আঘাত করে। বাঁচার তাগিদে রক্তাক্ত অবস্থায় ওই পথচারী কোনো রকমে দৌড়ে পালিয়ে নিজের প্রাণ রক্ষা করেন। স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এই লোমহর্ষক ছিনতাইয়ের ঘটনার পেছনে জড়িত রয়েছে এলাকার অন্যতম ত্রাস ‘কিলার বাদল’ গ্রুপের সদস্যরা।
সন্ত্রাসীদের দুঃসাহস এতটাই বৃদ্ধি পেয়েছে যে, একই দিনে এবং একই এলাকায় তারা চাঁদার জন্য পুরো মার্কেট বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে। একটি দোকানের সিসিটিভি ক্যামেরায় অডিওসহ রেকর্ড হওয়া একটি ফুটেজে দেখা যায়, কিলার বাদল গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যরা প্রকাশ্যে এসে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে যে, যদি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের চাঁদার টাকা বুঝিয়ে দেওয়া না হয়, তবে পুরো মার্কেটের প্রতিটি দোকান জোরপূর্বক বন্ধ করে দেওয়া হবে।
শুধু কিলার বাদল বা কালা রাসেল নয়; স্থানীয়দের তথ্যমতে পুরো মোহাম্মদপুর, আদাবর, ঢাকা উদ্যান, বসিলা সিটি হাউজিং এবং বেড়িবাঁধ এলাকায় সক্রিয় রয়েছে একাধিক ভয়ংকর কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসী বাহিনী। এর মধ্যে ‘মোল্লা কাউসার গ্যাং’, ‘গ্রেঞ্জ সোহেল গ্রুপ’, ‘কালা ফারুক বাহিনী’ এবং ‘বাত রাসেল’-এর নাম মানুষের মুখে মুখে উচ্চারিত হয়। এই গ্যাংগুলোর সদস্যদের বয়স মূলত ১৫ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। এরা প্রত্যেকেই এলাকায় মাদক ব্যবসা, জমি দখল, ছিনতাই এবং চাঁদাবাজির একটি বিশাল সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে। এদের অত্যাচারে স্থানীয় বাড়িওয়ালা থেকে শুরু করে ফুটপাতের চা বিক্রেতা পর্যন্ত কেউই রেহাই পাচ্ছেন না।
আদাবরের এমব্রয়ডারি কারখানায় হামলার ঘটনায় ইতোমধ্যে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানে এই ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে মূল অভিযুক্ত কালা রাসেলসহ কিশোর গ্যাংয়ের বেশ কয়েকজন সদস্যকে ইতোমধ্যে আটক করতে সক্ষম হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুরো এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এবং জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে পুলিশ ও র্যাবের টহল আগের চেয়ে বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। মোহাম্মদপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন ইটিসি বাংলাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে বলেন, “সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাং দমনে আমরা ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছি। প্রত্যেকটি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় আমাদের পুলিশের মোবাইল পেট্রোল টিম সার্বক্ষণিক টহলে রয়েছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চেকপোস্ট ও পাহারা জোরদার করা হয়েছে।”
তিনি সাধারণ জনগণকে আশ্বস্ত করে আরও বলেন, “যেকোনো ধরনের অপরাধমূলক ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গে বা সন্দেহজনক কিছু দেখলে আপনারা নির্ভয়ে আমাদের জানাবেন। তথ্য পাওয়া মাত্রই আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত রয়েছি। কোনো চাঁদাবাজ বা সন্ত্রাসীকে এই এলাকায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দেওয়া হবে না।”
রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে মোহাম্মদপুর ও আদাবরের যে পরিচিতি, তা আজ মুষ্টিমেয় কিছু কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসীদের কারণে চরম হুমকির মুখে। সামাজিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়া এবং বেড়িবাঁধের মতো ভৌগোলিক কাঠামোর সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা সহজেই অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তবে সচেতন নাগরিক সমাজের দাবি, শুধু সাময়িক অভিযান বা পুলিশি টহল নয়; বরং এই কিশোর গ্যাং কালচারের শেকড় উৎপাটন করতে হলে সেনাবাহিনী, র্যাব এবং পুলিশের সমন্বয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা একান্ত জরুরি। একই সাথে গ্যাং সদস্যদের মদদদাতাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে, তবেই কেবল বসিলা-আদাবরের সাধারণ মানুষ একটি নিরাপদ জীবনের নিশ্চয়তা পাবে।
