‘বিএনপির লোক আপনি থানায় নিতে পারবেন না’, ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে ছিনিয়ে নিতে পটুয়াখালীতে পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদলের বাগবিতণ্ডা

‘বিএনপির লোক আপনি থানায় নিতে পারবেন না। তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত মানছি, অন্য কিছু না। আমরা গণঅধিকার করি না, বিএনপি করি। যদি নিতে হয়, দুই আসামিকেই নিতে হবে।’— প্রকাশ্য রাস্তায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ঘিরে ধরে অত্যন্ত দম্ভ ও ঔদ্ধত্যের সঙ্গে এমন চাঞ্চল্যকর মন্তব্য করেছেন পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবুল বশার। একজন ওয়ারেন্টভুক্ত (গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত) আসামিকে পুলিশের হাত থেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টাকালে পুলিশের সঙ্গে এই চরম বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন তিনি ও তার অনুসারীরা।

সম্প্রতি এই অভাবনীয় ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে (ফেসবুক ও অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম) ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যা দেশজুড়ে রাজনৈতিক ও সাধারণ মহলে তুমুল সমালোচনার ঝড় তুলেছে। আইনের রক্ষকদের কাজে প্রকাশ্য বাধা প্রদান এবং দলের শীর্ষ নেতার নাম ব্যবহার করে বেআইনি দাবি আদায়ের এই অপচেষ্টা স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনার সৃষ্টি করেছে।


স্থানীয় সূত্র, প্রত্যক্ষদর্শী এবং ইটিসি বাংলার নিজস্ব অনুসন্ধানে জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাতে পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলা সদরে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ঘটনার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন চরবোরহান ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি রাকিব হোসেন। রাকিবের বিরুদ্ধে পূর্ব থেকেই আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) জারি ছিল। অভিযোগ রয়েছে, বৃহস্পতিবার রাতে উপজেলা সদরে বাংলাদেশ গণঅধিকার পরিষদের স্থানীয় নেতাকর্মীরা রাকিব হোসেনকে আটক করে মারধর করেন এবং পরবর্তীতে তাকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর (পুলিশ) হাতে তুলে দেন।

খবর পেয়ে দশমিনা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মনির হোসেন যখন আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি রাকিবকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই সেখানে নাটকীয়ভাবে উপস্থিত হন দশমিনা উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবুল বশার। তার নেতৃত্বে মুহূর্তের মধ্যেই সেখানে ৩০ থেকে ৪০ জন ছাত্রদলের বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মী জড়ো হয়ে যান। তারা চারপাশ থেকে পুলিশ সদস্যদের ঘিরে ফেলেন এবং আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার বা গ্রেপ্তারে বাধা দেওয়ার চেষ্টা চালান।


সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে দেখা যায়, উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবুল বশার অত্যন্ত উত্তেজিত অবস্থায় পুলিশের উপ-পরিদর্শক মনির হোসেনের সঙ্গে তর্কে লিপ্ত হয়েছেন। তিনি পুলিশের উদ্দেশ্যে আঙুল উঁচিয়ে বলছেন, ‘বিএনপির লোক আপনি থানায় নিতে পারবেন না। তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত মানছি, অন্য কিছু না। আমরা গণঅধিকার করি না, বিএনপি করি। যদি নিতে হয়, দুই আসামিকেই নিতে হবে।’

এ সময় তার সঙ্গে থাকা অন্যান্য ছাত্রদল কর্মীরাও পুলিশের বিরুদ্ধে স্লোগান ও হট্টগোল করতে থাকেন। তারা বারবার পুলিশের কাছে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার (ওয়ারেন্ট) মূল কাগজ দেখতে চেয়ে পুলিশের কাজে সরাসরি বাধা প্রদান করেন। একজন ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে আইনের হাতে সোপর্দ করার সময় রাজনৈতিক পরিচয়ের দোহাই দিয়ে এমন প্রকাশ্য বাধা প্রদান আইনের শাসনের প্রতি চরম অবজ্ঞা হিসেবেই দেখছেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। পরিস্থিতি ক্রমশ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার উপক্রম হলে, ঘটনাস্থলে থাকা পুলিশ সদস্যরা তাৎক্ষণিকভাবে দশমিনা থানায় খবর দেন। পরবর্তীতে থানা থেকে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স ঘটনাস্থলে পৌঁছালে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয় এবং পুলিশ রাকিবকে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে আসতে সক্ষম হয়। পরদিন শুক্রবার কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আইনি প্রক্রিয়া শেষে আদালতের মাধ্যমে রাকিবকে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।


এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ছাত্রদল এবং গণঅধিকার পরিষদের মধ্যে চরম উত্তেজনা ও পাল্টাপাল্টি অভিযোগের সৃষ্টি হয়েছে। পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবুল বশার তার কৃতকর্মের পক্ষে সাফাই গেয়ে ইটিসি বাংলাকে জানান, ‘চরবোরহান ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবকে গণঅধিকার পরিষদের নেতারা সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে। আমাদের দলের একজন নেতাকে মারধর করা হবে, আর আমরা চুপ থাকব, তা হতে পারে না। আমি শুধু এর জোর প্রতিবাদ করেছি। পুলিশকে বলেছি, যদি রাকিবকে নিতে হয়, তবে যারা তাকে মারধর করেছে তাদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে।’

অন্যদিকে, ছাত্রদলের এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বলে দাবি করেছেন দশমিনা উপজেলা গণঅধিকার পরিষদের সদস্য সচিব মিলন খান। তিনি ইটিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘রাকিব একজন ওয়ারেন্টভুক্ত ফেরারি আসামি। তাকে পুলিশ তাদের নিজস্ব গোয়েন্দা তথ্য ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গ্রেপ্তার করেছে। এখানে গণঅধিকার পরিষদের কোনো নেতাকর্মীর বিন্দুমাত্র সম্পৃক্ততা নেই। কিন্তু ছাত্রদল নেতারা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মনে করেছেন যে, আমরাই তাকে পুলিশে ধরিয়ে দিয়েছি। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, এই ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা উল্টো পুলিশের সামনেই আমার গায়ে হাত তুলেছেন এবং আমাকে লাঞ্ছিত করেছেন।’ তিনি এই ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেন।


পুরো ঘটনার বিষয়ে দশমিনা থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মনির হোসেন ইটিসি বাংলার কাছে ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বলেন, ‘চরবোরহান ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) ছিল। তাকে গ্রেপ্তার করার সময় দশমিনা উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক আবুল বশারসহ বেশ কয়েকজন যুবক আকস্মিকভাবে আমাদের কাজে বাধা প্রদান করেন। তারা চরম উত্তেজিত হয়ে আমাদের ঘিরে ধরেন এবং গ্রেপ্তারি পরোয়ানার কাগজ দেখতে চান। আমরা আইন অনুযায়ী তাদের ওয়ারেন্টের কাগজ প্রদর্শন করি। এরপর অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স ঘটনাস্থলে পৌঁছালে পরিস্থিতি সম্পূর্ণরূপে আমাদের নিয়ন্ত্রণে আসে এবং আমরা আসামিকে নিরাপদে থানায় নিয়ে আসি।’


রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক দলগুলোর তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পটুয়াখালীর দশমিনার এই ঘটনা তারই একটি নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বারবার দলের নেতাকর্মীদের কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, কেউ যেন দলের নাম ভাঙিয়ে কোনো ধরনের বেআইনি কাজ, চাঁদাবাজি বা নিজেদের হাতে আইন তুলে নেওয়ার মতো ধৃষ্টতা না দেখান। দলের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এমন কঠোর নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও, একজন উপজেলা পর্যায়ের ছাত্রদল নেতার মুখে ‘তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত মানছি’ বলে পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার ঘটনা দলের হাইকমান্ডের নির্দেশনার সম্পূর্ণ পরিপন্থি।

বিশ্লেষকদের মতে, ‘বিএনপির লোক আপনি থানায় নিতে পারবেন না’—এই ধরনের ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য সমাজে আইনের শাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে চরমভাবে দুর্বল করে দেয়। অপরাধী যে দলেরই হোক না কেন, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে—এটাই একটি গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজের মূল ভিত্তি। রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে অপরাধীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া বা পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার মতো সংস্কৃতি থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে বেরিয়ে আসতে হবে। দশমিনার এই ঘটনার পর সাধারণ জনগণের দাবি, যারা প্রকাশ্য রাস্তায় পুলিশের কাজে বাধা দিয়েছে এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদর্শন করে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করেছে, তাদের বিরুদ্ধেও প্রশাসনের কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। একইসঙ্গে, বিএনপির কেন্দ্রীয় হাইকমান্ডের উচিত অবিলম্বে এই ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যাতে ভবিষ্যতে দলের নাম ব্যবহার করে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে ওঠার দুঃসাহস দেখাতে না পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন