১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালি জাতি বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা ও অধিকার ছিনিয়ে আনলেও, দীর্ঘ সাত দশকের বেশি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও দেশের সাধারণ নাগরিকদের মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার আজও পুরোপুরি অধরা রয়ে গেছে বলে এক গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সম্মানিত আমির ডা. শফিকুর রহমান।
শুক্রবার (২০ ফেব্রুয়ারি) দিবাগত রাতে, মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে শায়িত ভাষা শহীদদের কবর জিয়ারত, পুষ্পস্তবক অর্পণ ও বিশেষ দোয়া মোনাজাত শেষে উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এই সুচিন্তিত ও সময়োপযোগী মন্তব্য করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এবং বিরোধীদলীয় নেতার পদে আসীন হয়ে একজন শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের এমন মন্তব্য দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার এক নিপুণ প্রতিচ্ছবি হিসেবেই দেখছেন সচেতন মহল।
একুশে ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে যখন সমগ্র জাতি ভাষা শহীদদের স্মরণে বিনম্র শ্রদ্ধায় অবনত, ঠিক সেই মুহূর্তের আগেই শুক্রবার দিবাগত রাতে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে আজিমপুর কবরস্থানে উপস্থিত হন ডা. শফিকুর রহমান। সেখানে এক অত্যন্ত আবেগঘন ও ভাবগম্ভীর পরিবেশের সৃষ্টি হয়। ১৯৫২ সালে মাতৃভাষা বাংলার সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় যে অকুতোভয় ছাত্র ও তরুণ সমাজ পুলিশের গুলির সামনে বুক পেতে দিয়ে শাহাদত বরণ করেছিলেন, তাদের অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়।
আজিমপুর কবরস্থানে দাফনকৃত ভাষা সৈনিকদের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ও তার সফরসঙ্গীরা পরম করুণাময়ের দরবারে শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনা করে ফাতেহা পাঠ ও সুরা ইখলাস তেলাওয়াত করেন। এরপর এক বিশেষ মোনাজাতের মাধ্যমে ভাষা শহীদদের সর্বোচ্চ মর্যাদার জন্য আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানানো হয়। একইসঙ্গে ১৯৫২ সাল থেকে শুরু করে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এ দেশে অধিকার আদায়ের প্রতিটি ন্যায়সঙ্গত ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যারা নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, তাদের সকলের রুহের মাগফেরাত কামনায়ও বিশেষ দোয়া করা হয়।
সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বাংলাদেশের মানুষের বঞ্চনা ও অধিকার আদায়ের এক সুদীর্ঘ কালপরিক্রমা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তুলে ধরেন। তিনি ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মহান মুক্তিযুদ্ধ, ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ ২০০৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে চলা চরম রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামগুলোর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করিয়ে দেন।
তিনি বলেন, “ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বিভিন্ন সময়ে এ দেশে প্রতিষ্ঠিত কায়েমি স্বার্থবাদী ও স্বৈরতান্ত্রিক সরকারগুলো সব সময়ই গায়ের জোরে এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ জনগণের ন্যায্য অধিকারগুলোকে চেপে ধরতে চেয়েছে। তাদের এই অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী আচরণের প্রতিবাদেই যুগে যুগে এ দেশের ছাত্র, জনতা ও মেহনতি মানুষ বারবার তীব্র আন্দোলন ও বিদ্রোহ গড়ে তুলেছে।”
আক্ষেপের সুরে তিনি আরও বলেন, “বায়ান্নর রক্তস্নাত পথ ধরে আমরা আমাদের মাতৃভাষার অধিকার হয়তো পেয়েছি, কিন্তু স্বাধীন ভূখণ্ড পাওয়ার পরও একটি রাষ্ট্রের নাগরিকদের যে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার থাকার কথা, তা আজও পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত যেমন আমরা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা চরম বঞ্চনা ও শোষণের শিকার হয়েছিলাম, তেমনি স্বাধীনতার এত বছর পরও এ দেশের সাধারণ মানুষ তাদের কাঙ্ক্ষিত ন্যায়বিচার ও সমঅধিকার থেকে চরমভাবে বঞ্চিত রয়ে গেছে।”
ভাষা আন্দোলনের মূল কারিগর ছিল এ দেশের অকুতোভয় তরুণ সমাজ। সেই তরুণদের সাহসিকতার বন্দনা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “দেশের জন্য যারা জীবন দেন, সেই বীররা কখনো হারিয়ে যান না। তারা ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকেন। বায়ান্নর ভাষা শহীদরা তাদের রক্তের বিনিময়ে আমাদের এই শিক্ষাই দিয়ে গেছেন যে—হক আদায় করে কেউ দেয় না, নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম ও লড়াইয়ের মাধ্যমেই নিজেদের ন্যায্য অধিকার ছিনিয়ে আনতে হয়।”
তিনি অত্যন্ত জোরালো কণ্ঠে স্পষ্ট করে জানান যে, তাদের বর্তমান এই রাজনৈতিক সংগ্রাম সমাজের কোনো বিশেষ বা এলিট শ্রেণির সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির জন্য নয়; বরং এই লড়াই এ দেশের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ, দিনমজুর, কৃষক, শ্রমিক এবং মাঝি-মাল্লাদের প্রকৃত মুক্তির জন্য। তরুণ সমাজের প্রতি বিশেষ বার্তা দিয়ে তিনি বলেন, “আজকের তরুণরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তাদের যে বাস্তবসম্মত ও ন্যায়সংগত স্বপ্ন রয়েছে, তা পূরণে আমরা সবসময় তাদের পাশে থাকার দৃঢ় অঙ্গীকার করছি।” এছাড়া দেশের শিশুদের আগামী দিনের সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একটি নিরাপদ ও উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে তার দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের উদাত্ত আহ্বান জানান বিরোধীদলীয় নেতা।
দেশের বর্তমান সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জামায়াত আমির বলেন, যতদিন না পর্যন্ত স্বাধীন বাংলাদেশে একটি প্রকৃত মানবিক ও কল্যাণকামী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত তাদের এই নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক লড়াই অব্যাহত থাকবে।
তিনি তার স্বপ্নের রাষ্ট্রকাঠামোর রূপরেখা তুলে ধরে বলেন, “আমাদের এমন একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র দরকার, যেখানে প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমান ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও লুটপাট সমূলে নির্মূল করা হবে এবং দেশের প্রতিটি সাধারণ মানুষ একটি নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করার গ্যারান্টি পাবে।”
শহীদদের পবিত্র রক্ত কোনোভাবেই বৃথা যেতে দেওয়া হবে না মর্মে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “প্রয়োজনে নিজেদের জীবন বিলিয়ে দিয়ে হলেও আমরা এই জাতির হারানো অধিকার ফিরিয়ে আনব ইনশাআল্লাহ।” বক্তব্যের শেষভাগে তিনি তার দলের আদর্শিক অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, “আমরা বিশ্বাস করি, মানুষের তৈরি কোনো মতবাদ দিয়ে সম্পূর্ণ নিখুঁত সমাজ গড়া সম্ভব নয়। এ দেশে প্রকৃত ন্যায়বিচার ও ইনসাফ তখনই শতভাগ প্রতিষ্ঠিত হবে, যখন মহান আল্লাহর দেওয়া দ্বীনের ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় ফয়সালা ও শাসনব্যবস্থা কায়েম হবে।”
মহান মাতৃভাষা দিবসের মতো একটি সর্বজনীন ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিনে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং জামায়াতে ইসলামীর আমিরের এই বক্তব্য দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বহুমুখী তাৎপর্য বহন করে। একসময় যে দলটির বিরুদ্ধে স্বাধীনতাবিরোধী হওয়ার অভিযোগ এনে তাদের রাজনৈতিক অধিকার খর্ব করার চেষ্টা করা হয়েছিল, আজ সেই দলের শীর্ষ নেতাই বায়ান্নর ভাষা শহীদ এবং একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে নাগরিক অধিকার আদায়ের ডাক দিচ্ছেন। এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মেরুকরণে এক বিশাল ও গুণগত পরিবর্তনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত।
ডা. শফিকুর রহমান তার বক্তব্যে ভাষা আন্দোলনের আবেগকে পুঁজি করে অত্যন্ত সুকৌশলে দেশের বর্তমান সময়ের দুর্নীতি, চাঁদাবাজি এবং আইনের শাসনের অভাবকে সামনে নিয়ে এসেছেন। সাধারণ মানুষ, কৃষক ও শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের যে প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছেন, তা দেশের বৃহত্তর ভোটব্যাংকের কাছে একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই পৌঁছাবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। একইসঙ্গে, আল্লাহর আইনের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার যে কথা তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, তা তাদের মূল আদর্শিক ভোটারদেরও উজ্জীবিত করবে। সব মিলিয়ে, অধিকার আদায়ের এই নতুন লড়াই আগামী দিনে দেশের রাজনীতিতে কী ধরনের প্রভাব ফেলে, এখন সেটিই দেখার বিষয়।
