দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে যখন নতুন মেরুকরণ চলছে, ঠিক তখনই নিজেদের নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থান শক্তিশালী করতে বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে ভারত। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডকে সংযুক্তকারী অত্যন্ত সংবেদনশীল ‘চিকেন্স নেক’ বা ‘শিলিগুড়ি করিডর’-এ মাটির নিচে সুড়ঙ্গ কেটে রেলপথ নির্মাণের পরিকল্পনা প্রায় চূড়ান্ত করেছে দিল্লি। একইসঙ্গে আসামে ব্রহ্মপুত্র নদের তলদেশ দিয়ে রেল ও সড়কপথের সমন্বয়ে দীর্ঘ সুড়ঙ্গপথ তৈরির অনুমোদন দিয়েছে নরেন্দ্র মোদীর সরকার।
সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশ ও চীনের সঙ্গে থাকা সীমান্তের কাছাকাছি এই প্রকল্পগুলো কেবল যোগাযোগ অবকাঠামো নয়, বরং এর পেছনে রয়েছে গভীর সামরিক ও নিরাপত্তা কৌশল। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিবেশী দেশগুলোর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ভারত তাদের ‘আকিলিস হিল’ বা দুর্বল বিন্দু হিসেবে পরিচিত এই করিডরকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তার চাদরে ঢাকতে চাইছে।
ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি রাজ্যকে সংযুক্ত করেছে যে সরু ভূখণ্ডটি, সেটিই ‘চিকেন্স নেক’ বা শিলিগুড়ি করিডর নামে পরিচিত। এই করিডরের কোনো কোনো অংশ মাত্র ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার চওড়া। এর একপাশে বাংলাদেশ, উত্তরে চীন এবং পশ্চিমে নেপাল। কৌশলগতভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই এলাকায় মাটির নিচ দিয়ে রেল যোগাযোগ স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে ভারতীয় রেলওয়ে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুর জেলার তিন মাইল হাট থেকে শুরু হয়ে শিলিগুড়ি শহর হয়ে প্রায় ৩৬ কিলোমিটার দূরের রাঙাপাণি পর্যন্ত মাটির গভীরে সুড়ঙ্গ তৈরি করা হবে। এই সুড়ঙ্গের ভেতর দিয়েই বসানো হবে রেললাইন।
উত্তর-পূর্ব ফ্রন্টিয়ার রেলওয়ের প্রধান জনসংযোগ আধিকারিক (সিপিআরএ) কপিঞ্জল কিশোর শর্মা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘‘প্রকল্পটির পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা প্রস্তুত করা হয়েছে। যদিও চূড়ান্ত অনুমোদন এখনও আসেনি, তবে বিষয়টি সরকারের সর্বোচ্চ বিবেচানাধীন রয়েছে।’’ এর আগে ভারতের রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব কেন্দ্রীয় বাজেটের পর এই প্রকল্পের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, ১২ হাজার কোটি ভারতীয় রুপি বাজেটের এই প্রকল্পটি শীঘ্রই আলোর মুখ দেখবে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, প্রস্তাবিত এই ভূগর্ভস্থ পথে দুটি পৃথক সমান্তরাল সুড়ঙ্গ থাকবে। অত্যাধুনিক ‘টানেল বোরিং মেশিন’ (TBM) ব্যবহার করে এই সুড়ঙ্গ খনন করা হবে। এটি এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা যুদ্ধের মতো জরুরি পরিস্থিতিতেও যোগাযোগ ব্যবস্থা অক্ষুণ্ন থাকে।
চিকেন্স নেকের পাশাপাশি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে আরেকটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে মোদী সরকার। গত শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ‘ক্যাবিনেট কমিটি অন ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্স’-এর বৈঠকে আসামের ব্রহ্মপুত্র নদের নিচ দিয়ে সুড়ঙ্গ তৈরির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
এটি হবে ভারতের প্রথম কোনো সুড়ঙ্গ, যার ভেতর দিয়ে ট্রেন এবং গাড়ি—উভয়ই চলাচল করতে পারবে। ব্রহ্মপুত্রের তলদেশ দিয়ে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সুড়ঙ্গটি গহপুর এবং নুমালিগড়কে সংযুক্ত করবে। প্রকল্পের মোট দৈর্ঘ্য ধরা হয়েছে ৩৩.৭ কিলোমিটার, যার মধ্যে ১৫.৭৯ কিলোমিটার অংশ থাকবে নদীর তলদেশে।
সরকারি বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, বর্তমানে নুমালিগড় থেকে গহপুর পৌঁছাতে সড়কপথে প্রায় ৬ ঘণ্টা সময় লাগে এবং পাড়ি দিতে হয় ২৪০ কিলোমিটার পথ। এই টানেলটি চালু হলে সেই দূরত্ব ও সময় নাটকীয়ভাবে কমে আসবে। এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে অরুণাচল প্রদেশ এবং আসামের উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
ভারতের এই হঠাৎ তোড়জোড়ের পেছনে শুধুই যাত্রী পরিবহন বা বাণিজ্য নয়, বরং সামরিক প্রস্তুতির বিষয়টিই মুখ্য বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা। চিকেন্স নেক করিডরটি ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য ‘লাইফলাইন’। যুদ্ধকালীন সময়ে সেনা সদস্য, ট্যাংক, আর্টিলারি এবং রসদ পরিবহনের জন্য এই পথটি অপরিহার্য।
প্রস্তাবিত ভূগর্ভস্থ রেলপথটি বাংলাদেশ সীমান্তের অত্যন্ত কাছাকাছি তিনটি নতুন ভারতীয় সেনা ঘাঁটির পাশ দিয়ে যাবে। এর মধ্যে দুটি ঘাঁটি বিহারের কিষাণগঞ্জ এবং পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুরের চোপড়ায় অবস্থিত। তৃতীয়টি আসামের ধুবড়িতে। এছাড়া বাগডোগরা বিমানঘাঁটি এবং শিলিগুড়ির উপকন্ঠে ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৩৩ কোরের সদর দপ্তরের (ত্রিশক্তি কর্পস) সঙ্গেও এই রেললাইনের সরাসরি সংযোগ থাকবে।
সামরিক বিশ্লেষক এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার প্রবীর সান্যাল সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘‘সত্তরের দশকে আমরা যখন সিকিমে কর্মরত ছিলাম, তখন থেকেই শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ছিল। চীন যদি ভুটান হয়ে আক্রমণ চালায় অথবা বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে কোনো হুমকি আসে, তবে এই করিডর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার শঙ্কা থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ থেকে চিকেন্স নেক নিয়ে যেসব ‘উস্কানিমূলক’ বক্তব্য শোনা যাচ্ছে, তাতে ভারতের সতর্ক হওয়া ছাড়া উপায় নেই।’’
তিনি আরও বলেন, ‘‘মাটির নিচের এই সুড়ঙ্গপথ ২০ বছর আগেই হওয়া উচিত ছিল। এটি এমনভাবে তৈরি করা হবে যাতে মিসাইল হামলাতেও ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। ফলে যুদ্ধের সময় ওপরের অবকাঠামো ধ্বংস হলেও মাটির নিচ দিয়ে সেনা ও সরঞ্জাম পরিবহন অব্যাহত থাকবে।’’
নিরাপত্তা বিশ্লেষক প্রতীম রঞ্জন বসু জানান, বর্তমানে ভারত যতগুলো টানেল বা অবকাঠামো তৈরি করছে, তার সবকটিতেই সামরিক দিকটি প্রাধান্য পাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘‘চিকেন্স নেক অঞ্চলটি জনবহুল এবং এখান দিয়ে বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, তেল ও গ্যাসের লাইন চলে গেছে। তাই মাটির ওপরে নতুন রেলপথ করা কঠিন। কিন্তু ভূগর্ভস্থ পথে নিরবচ্ছিন্নভাবে এবং শত্রুপক্ষের নজর এড়িয়ে (অ-দৃশ্যমানভাবে) সেনা কনভয় চলাচল করতে পারবে।’’
ব্রহ্মপুত্রের নিচের টানেলটিও একইভাবে তেজপুর বিমানঘাঁটির সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করবে, যেখানে ভারতীয় বিমান বাহিনীর সুখোই-৩০ এমকিআই যুদ্ধবিমানের স্কোয়াড্রন মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া অরুণাচল প্রদেশের সীমান্তে দ্রুত সেনা মোতায়েনেও এই টানেল গেম চেঞ্জার হিসেবে কাজ করবে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ভারতের নিরাপত্তা কৌশলে যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে, এই মেগাপ্রকল্পগুলো তারই প্রমাণ। একদিকে ‘চিকেন্স নেক’ করিডরে ভূগর্ভস্থ রেল, অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্রের নিচে টানেল—সব মিলিয়ে ভারত তাদের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে সামরিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করতে চাইছে। ১২ হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্প যখন বাস্তবায়িত হবে, তখন তা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভারতের অবস্থানকে আরও সুসংহত করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
