ভালোবাসা দিবসে জ্যাকুলিনকে হেলিকপ্টার দিলেন সুকেশ চন্দ্রশেখর!

ভালোবাসা দিবস মানেই কি শুধুই গোলাপ, চকলেট কিংবা দামী আংটি? সাধারণের ভাবনার সীমানা যেখানে শেষ হয়, ঠিক সেখান থেকেই যেন ভালোবাসার নতুন সংজ্ঞা লিখতে শুরু করেন ভারতের আলোচিত ‘কনম্যান’ সুকেশ চন্দ্রশেখর। চারদেয়ালের বন্দিদশা কিংবা হাজারো আইনি জটিলতা—কোনোকিছুই যেন তার প্রেমের আবেগে বাঁধ সাধতে পারছে না। আর্থিক প্রতারণার মামলায় দীর্ঘদিন ধরে দিল্লির কারাগারে বন্দী থেকেও বলিউড অভিনেত্রী জ্যাকুলিন ফার্নান্দেজের জন্য তার ভালোবাসার নজির ফের সংবাদপত্রের শিরোনামে। এবারের ভালোবাসা দিবসে (১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬) তিনি জ্যাকুলিনকে উপহার দিয়েছেন একটি অত্যাধুনিক বিলাসবহুল হেলিকপ্টার।

কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে পাঠানো এই উপহার এবং তার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া আবেগঘন চিঠি বলিউডের অন্দরমহলে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। ২০০ কোটি রুপির বিশাল জালিয়াতির মামলার প্রধান আসামি হয়েও সুকেশ যেভাবে একের পর এক রাজকীয় উপহারের ডালি সাজিয়ে চলেছেন, তা হার মানায় সিনেমার চিত্রনাট্যকেও।

প্রতিবারের মতো এবারও সুকেশের চিঠিতে জ্যাকুলিনকে সম্বোধন করা হয়েছে ‘বেবি বম্মা’ নামে। ভালোবাসা দিবসে পাঠানো সুকেশের এই উপহারটি সাধারণ কোনো চপার নয়। জানা গেছে, এটি একটি বিশেষ কালো রঙের বিলাসবহুল হেলিকপ্টার, যার গায়ে খোদাই করা রয়েছে জ্যাকুলিন ফার্নান্দেজের নামের আদ্যক্ষর। শুধু তাই নয়, হেলিকপ্টারটির অন্দরসজ্জাও করা হয়েছে অভিনেত্রীর রুচি ও পছন্দের কথা মাথায় রেখে।

কিন্তু হঠাৎ হেলিকপ্টার কেন? এই প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন সুকেশ তার চিঠিতে। মুম্বাইয়ের কুখ্যাত যানজট বা ট্র্যাফিকের কথা কারোরই অজানা নয়। সুকেশের দাবি, তার প্রিয়তমা যেন মুম্বাইয়ের এই অসহ্য জ্যাম এড়িয়ে দ্রুত এবং আরামদায়কভাবে যাতায়াত করতে পারেন, সেই ভাবনা থেকেই এই আকাশযানটি উপহার দেওয়া। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, জ্যাকুলিনের সামান্য কষ্টও তাকে ব্যথিত করে, তাই এই ব্যবস্থা।

উপহারের সঙ্গে পাঠানো দীর্ঘ চিঠিতে সুকেশ তার নিঃসঙ্গতার কথা তুলে ধরেছেন অত্যন্ত কাব্যিক ভাষায়। তিনি লিখেছেন, জ্যাকুলিনকে না দেখে তার দিনগুলো কাটছে মরুভূমিতে পথ হারানো তৃষ্ণার্ত পথিকের মতো। কারাগারের একাকিত্ব তাকে গ্রাস করলেও জ্যাকুলিনের প্রতি ভালোবাসাই তাকে মানসিকভাবে বাঁচিয়ে রেখেছে।

চিঠিতে সুকেশ লিখেছেন, “আমাদের মধ্যে দূরত্ব থাকলেও, এই প্রেমই আমাদের এক করে রেখেছে। এই ভালোবাসা এক অদৃশ্য সেতু। আমি জানি, আমার কারণে তোমাকে অনেক আইনি ঝামেলার মোকাবিলা করতে হচ্ছে, অনেক কটু কথা শুনতে হচ্ছে, যা তোমার প্রাপ্য ছিল না। এর জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী।” তিনি আরও দাবি করেন, জ্যাকুলিনের হৃদয়ের ওপর একমাত্র তার অধিকারই রয়েছে এবং পৃথিবীর অন্য কোনো পুরুষের সেখানে প্রবেশাধিকার নেই। সুকেশের এই একতরফা অধিকারবোধ এবং পাগলামি মিশ্রিত ভালোবাসা অনেককেই স্তম্ভিত করেছে।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, জেলবন্দি অবস্থায় ২০০ কোটি টাকার প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত একজন ব্যক্তি কীভাবে হেলিকপ্টারের মতো দামী উপহার কেনেন? এই প্রশ্নের আগাম উত্তরও সুকেশ তার চিঠিতে দিয়ে রেখেছেন। তার দাবি, এই উপহার তিনি সম্পূর্ণ নিজের ‘কষ্টার্জিত’ এবং বৈধ অর্থ দিয়ে কিনেছেন। এর সঙ্গে কোনো অবৈধ লেনদেন বা জালিয়াতির টাকার সম্পর্ক নেই।

যদিও তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) সুকেশের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর কড়া নজর রাখছে। অতীতেও দেখা গেছে, সুকেশ জেলের ভেতর থেকেও নিজের প্রভাব খাটিয়ে বাইরে টাকা লেনদেন করেছেন। তাই এই ‘বৈধ আয়ের’ দাবি কতটা সত্য, তা নিয়ে যথেষ্ট সংশয় রয়েছে আইনশৃঙ্খল রক্ষাকারী বাহিনীর।

সুকেশের এমন কাণ্ড এবারই প্রথম নয়। ঠিক এক বছর আগে, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ভালোবাসা দিবসেও তিনি জ্যাকুলিনকে চমকে দিয়েছিলেন। সেবার তিনি ঘোষণা করেছিলেন একটি বিলাসবহুল ‘প্রাইভেট জেট’ উপহার দেওয়ার। সেই জেটটির বিশেষত্ব ছিল এর রেজিস্ট্রেশন নম্বরে, যা রাখা হয়েছিল জ্যাকুলিনের জন্মতারিখ অনুসারে। বিমানের গায়েও খোদাই করা ছিল অভিনেত্রীর নাম।

শুধু বিশেষ দিবসই নয়, জ্যাকুলিনের জন্মদিন, ইস্টার সানডে কিংবা নতুন বছরেও নিয়ম করে জেল থেকে চিঠি ও উপহার পাঠান সুকেশ। কখনো দামী বিড়াল, কখনো বিদেশি ঘোড়া, আবার কখনো হীরা-জহরত—সুকেশের উপহারের তালিকা বেশ দীর্ঘ। যদিও এসব উপহারের অধিকাংশই এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ED) বাজেয়াপ্ত করেছে বিভিন্ন সময়ে।

এই পুরো নাটকের অপর প্রান্তে থাকা জ্যাকুলিন ফার্নান্দেজ বরাবরই সুকেশের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক অস্বীকার করে আসছেন। ইডি এবং আদালতের জিজ্ঞাসাবাদে তিনি বারবার বলেছেন, সুকেশ তাকে নিজের পরিচয় গোপন করে বিভ্রান্ত করেছিলেন এবং তিনি সুকেশের প্রতারণার শিকার। সুকেশের কারণে জ্যাকুলিনকে একাধিকবার আদালতে হাজিরা দিতে হয়েছে, বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হয়েছে এবং তার ক্যারিয়ারও বড়সড় ধাক্কা খেয়েছে।

তবুও সুকেশ নাছোড়বান্দা। জ্যাকুলিনের প্রত্যাখ্যান বা আইনি বিবৃতি—কোনোকিছুই তাকে দমাতে পারছে না। বরং প্রতিবার তিনি আরও দ্বিগুণ উৎসাহে নিজের ভালোবাসা প্রমাণের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। সুকেশের আইনজীবীর মাধ্যমে পাঠানো এই চিঠি ও উপহারগুলো একদিকে যেমন জ্যাকুলিনের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে মিডিয়ার জন্য হয়ে উঠছে মুখরোচক খোরাক।

ভারতের অন্যতম বড় ‘কনম্যান’ সুকেশ চন্দ্রশেখর বর্তমানে দিল্লির মণ্ডোলি কারাগারে বন্দী। ফর্টিস হেলথকেয়ারের প্রবর্তকের স্ত্রীর কাছ থেকে ২০০ কোটি রুপি চাঁদাবাজির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলা চলছে। কিন্তু অপরাধ জগত ছাপিয়ে তার এই ‘প্রেমিক’ সত্তা বারবার আলোচনায় উঠে আসছে। ভালোবাসা দিবসে হেলিকপ্টার উপহার দেওয়ার ঘটনাটি আবারও প্রমাণ করল, সুকেশ চন্দ্রশেখর কেবল টাকার অঙ্কেই নয়, ভালোবাসার পাগলামিতেও সব সীমা ছাড়াতে প্রস্তুত। এখন দেখার বিষয়, আইনি জটিলতার বেড়াজালে এই ‘হেলিকপ্টার প্রেম’ শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন