খেলার মাঠে রাজনীতির অভিযোগ

বিশ্ব ক্রিকেটে নজিরবিহীন এক সঙ্কটের সূচনা হলো। ‘খেলার মাঠে রাজনীতি’র অভিযোগ তুলে এবং টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশকে বাদ দেওয়ার প্রতিবাদে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ না খেলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ গতকাল বুধবার এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে এই ঐতিহাসিক ও কঠোর সিদ্ধান্তের কথা জানান। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, আইসিসির বিতর্কিত সিদ্ধান্তের জেরে বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়া বাংলাদেশের পাশে নিঃশর্তভাবে দাঁড়াবে তাঁর সরকার। পাকিস্তানের এই ঘোষণার ফলে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া ২০২৬ আইসিসি টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ ঘিরে চরম অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে।

গতকাল বুধবার ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ প্রসঙ্গে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি বলেন, “টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ নিয়ে আমরা খুব পরিষ্কার ও নীতিগত অবস্থান নিয়েছি—আমরা ভারতের বিপক্ষে কোনো ম্যাচ খেলব না। কারণ, আমরা বিশ্বাস করি খেলার মাঠে কোনো প্রকার রাজনীতি থাকা উচিত নয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের বন্ধুরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে যা করা হয়েছে, তা খেলার স্পিরিটের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।”

শাহবাজ শরিফ আরও উল্লেখ করেন, এই সিদ্ধান্তটি আবেগের বশবর্তী হয়ে নেওয়া হয়নি, বরং এটি একটি সুচিন্তিত পদক্ষেপ। তিনি বলেন, “আমরা খুব ভেবেচিন্তে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এই মুহূর্তে আমাদের পুরোপুরি বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো উচিত। আমি মনে করি, এটি খুবই উপযুক্ত এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত।” প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের মাধ্যমে এটি স্পষ্ট হয়েছে যে, পাকিস্তান কেবল ক্রিকেটীয় কারণেই নয়, বরং কূটনৈতিক ও নৈতিক জায়গা থেকেও বাংলাদেশের প্রতি হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

ঘটনার সূত্রপাত গত ৩ জানুয়ারি, যখন ভারতের উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলোর হুমকির মুখে বাংলাদেশের তারকা পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ (আইপিএল) থেকে বাদ দেওয়া হয়। এই ঘটনার পর বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা নিয়ে চরম শঙ্কার সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশ সরকার ও ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, খেলোয়াড়দের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা ভারতে দল পাঠাবে না।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানান, আইসিসি এবং ভারত সরকার—কেউই বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো আশ্বাস দিতে পারেনি। এমতাবস্থায় বাংলাদেশ দলের ভেন্যু পরিবর্তন করে শ্রীলঙ্কায় ম্যাচ আয়োজনের অনুরোধ জানানো হয়েছিল আইসিসির কাছে। কিন্তু আইসিসি সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে এবং মোস্তাফিজুর রহমানের ঘটনাকে ‘বিচ্ছিন্ন ও অপ্রাসঙ্গিক’ বলে উড়িয়ে দেয়। শেষ পর্যন্ত নিজেদের অবস্থানে অটল থাকায় বাংলাদেশকে টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করে আইসিসি।

পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি) শুরু থেকেই বাংলাদেশের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিল। পিসিবি চেয়ারম্যান মহসিন নাকভি আইসিসির এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, অতীতে ভারত ও পাকিস্তানের ক্ষেত্রে সামান্য নিরাপত্তাশঙ্কা দেখা দিলেই ভেন্যু পরিবর্তন বা নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলার নজির রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কেন সেই নিয়ম মানা হলো না?

নাকভি বলেন, “আইসিসি এখানে স্পষ্টতই দ্বিমুখী নীতি অবলম্বন করেছে। বাংলাদেশের প্রতি চরম অন্যায় করা হয়েছে। নিরাপত্তাশঙ্কাকে গুরুত্ব না দিয়ে একটি পূর্ণ সদস্য দেশকে বিশ্বকাপ থেকে বাদ দেওয়া নজিরবিহীন।” জানা গেছে, আইসিসির বোর্ড সভায় ভেন্যু বদলের ভোটাভুটিতে মহসিন নাকভি সরাসরি বাংলাদেশের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এবং ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) প্রভাবে বাংলাদেশের দাবি অগ্রাহ্য করা হয়।

আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি ভারত ও শ্রীলঙ্কার যৌথ আয়োজনে শুরু হতে যাচ্ছে ২০২৬ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ। সূচি অনুযায়ী, আগামী ১৫ ফেব্রুয়ারি কলম্বোয় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার হাই-ভোল্টেজ ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কলম্বো নিরপেক্ষ ভেন্যু হওয়া সত্ত্বেও, পাকিস্তান সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তারা ভারতের বিপক্ষে কোনোভাবেই মাঠে নামবে না।

গত রোববার পাকিস্তান সরকারের এক্স (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডল থেকে দেওয়া এক পোস্টে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়, ভারত-ম্যাচ খেলবে না পাকিস্তান দল। যদিও পিসিবি প্রকাশ্যে এ নিয়ে কোনো সংবাদ সম্মেলন করেনি, তবে সরকারি নির্দেশনাই যে চূড়ান্ত, তা বলাই বাহুল্য। এদিকে, পাকিস্তানের এই ঘোষণার পরপরই আইসিসি এক বিবৃতিতে পাকিস্তানকে সতর্ক করে দিয়েছে। তারা বলেছে, এই সিদ্ধান্ত ‘দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব’ ফেলতে পারে এবং পাকিস্তানকে সিদ্ধান্তটি ‘পুনর্বিবেচনা’ করার আহ্বান জানিয়েছে। আইসিসির এই প্রচ্ছন্ন হুমকি সত্ত্বেও পাকিস্তান সরকার তাদের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে বলে জানা গেছে।

ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ না হওয়া মানে বিশ্বকাপের জৌলুস অর্ধেকের বেশি কমে যাওয়া। সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপন এবং টিকিট বিক্রি থেকে যে বিপুল আয়ের আশা করেছিল আইসিসি, পাকিস্তানের এই বয়কটের ফলে তাতে বড়সড় ধস নামতে পারে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্রিকেট খেলুড়ে দেশের অসন্তোষ এশীয় ক্রিকেটে এক বড় বিভাজন তৈরি করতে পারে।

পাকিস্তান সরকারের এই সিদ্ধান্তকে অনেকে দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেটে একটি নতুন মেরুকরণ হিসেবে দেখছেন। ভারতের আধিপত্যের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান একজোট হয়ে প্রতিবাদ জানাচ্ছে, যা বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসির জন্যও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, বিশেষ করে আইসিসি কোনো সমঝোতায় আসতে পারে কিনা, সেদিকেই তাকিয়ে আছে সারা বিশ্বের ক্রিকেটপ্রেমীরা। তবে শাহবাজ শরিফের দৃঢ় কণ্ঠস্বর আভাস দিচ্ছে, খেলার মাঠের এই লড়াই এখন আর কেবল ব্যাটে-বলে সীমাবদ্ধ নেই, তা গড়িয়েছে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙিনায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

চলুন